বাংলাদেশের প্রবহমান অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রধান দুটি উৎস হচ্ছে বৈদেশিক শ্রমবাজার এবং তৈরি পোশাক খাত। এই দুই আয়ের অন্যতম ক্ষেত্র বৈদেশিক শ্রমবাজার ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় বাংলাদেশি কর্মীদের বিদেশমুখী প্রবণতা এবং ঝুঁকি দুই-ই বেড়েছে। দক্ষতার অভাবে উন্নত দেশগুলোয় তারা প্রবেশাধিকার পাচ্ছেন না। এমনকি যেসব দেশে যাওয়ার সহজ সুযোগ আছে তাও সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এখন প্রয়োজন বিশ্বজুড়ে এই শ্রমবাজার যাতে আরও বহুমুখী ও সম্প্রসারিত হয়, সে ব্যাপারে উদ্যোগী হওয়া।
সরকারি তথ্যমতে, কাজ নিয়ে বাংলাদেশিরা বিশ্বের ১৭৬টি দেশে যান। বাংলাদেশ থেকে গত অর্থবছরে (২০২৩-২৪) ১১ লাখ ৯৬ হাজার শ্রমিক কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, তার আগের বছর (২০২২-২৩) গিয়েছিলেন ১১ লাখ ৩৭ হাজার শ্রমিক। এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত গেছেন ৩ লাখ ১৫ হাজার কর্মী। বিগত অর্থবছরে প্রায় ৪৪ শতাংশ অভিবাসী কর্মীর গন্তব্য ছিল সৌদি আরব এবং ২২ শতাংশের গন্তব্য ছিল মালয়েশিয়া। এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত বিদেশে যাওয়া কর্মীদের ৭৩ শতাংশ গেছেন সৌদি আরব।
পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, বিদেশমুখী বেশির ভাগ শ্রমিকের গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব এশিয়া। মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরবেই যাচ্ছেন সিংহভাগ শ্রমিক। আমাদের বৈদেশিক শ্রমবাজার তাই সৌদিনির্ভর। স্বাভাবিক নিয়মে এ বাজারও ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে। বিশ্বের অন্যত্রও সরকারের এই শ্রমবাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেই। ভবিষ্যতে স্বাভাবিক নিয়মে এ সুবিধা থাকবে না। রেমিট্যান্সপ্রবাহে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে বেকারত্ব বাড়বে। সংকট আরও বাড়বে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ ৩০ হাজার; বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ। গত বছর এই হার ছিল ৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ। এক গবেষণায় দেখা যায়, এই বেকারদের এক-তৃতীয়াংশ বিদেশে কাজের জন্য পাড়ি দিয়েছেন। বৈদেশিক শ্রমবাজারের কারণে তারা এ সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু বৈদেশিক শ্রমবাজার সংকুচিত হয়ে এলে দেশে বেকারের হার ও সংখ্যা বেড়ে যাবে। তাই শ্রমবাজার সম্প্রসারণে মনোযোগী হতে হবে।
এ লক্ষ্যে প্রথমেই পূর্বতন বাজারগুলো পুনরুজ্জীবিত করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোয় গিয়ে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে এ কাজটি হাতে নেওয়া যেতে পারে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো সহায়ক হতে পারে। বেশি জরুরি হচ্ছে নতুন শ্রমবাজার খুঁজে বের করা এবং সেসব দেশে শ্রমিক পাঠানোর চেষ্টা করা।
এখন পর্যন্ত আমাদের বৈদেশিক শ্রমবাজার সীমাবদ্ধ হয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্য আর পূর্ব এশিয়ায়। এ দুটি অঞ্চলে নতুন করে শ্রমবাজার খুব একটা বাড়বে না, সে সুযোগও নেই। কিন্তু আমরা নজর দিতে পারি ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। কিছুদিন আগে ইউরোপের রোমানিয়ায় শ্রমিক গেছেন। কিন্তু যারা গেছেন তাদের অধিকাংশই নিয়োগ চুক্তি ভঙ্গ করে ইউরোপের অন্য দেশে চলে যাওয়ায় রোমানিয়া এখন বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ইতালির ক্ষেত্রেও সমস্যা হচ্ছে। অবৈধভাবে সে দেশে অনেক বাংলাদেশি শ্রমিক ঢুকে পড়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য নেতিবাচক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তা সত্ত্বেও ইউরোপের অন্যান্য দেশে এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের কর্মীদের পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেসব দেশ দক্ষ শ্রমিক পেতে আগ্রহী। বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ শ্রমিকদেরই চাহিদা আছে দেশগুলোতে।
আমাদের প্রয়োজন প্রশিক্ষিত কর্মী। সরকারকে প্রশিক্ষিত কর্মী সৃষ্টির ব্যবস্থা নিতে হবে। এটা করতে হবে ব্যাপক পরিসরে, পরিকল্পনা করে। এ জন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে শিক্ষাব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আনা দরকার হবে। সাধারণ বিষয়ে ভূরি ভূরি ডিগ্রিধারী গ্র্যাজুয়েট-মাস্টার্স তৈরি না করে চাকরিপ্রত্যাশী দক্ষ কর্মী তৈরি করা প্রয়োজন। তবে এ কাজে হাত দেওয়ার আগে খুঁজে দেখতে হবে সম্ভাব্য শ্রমবাজারগুলো কী হতে পারে; কোন দেশের কী চাহিদা। পুরো ব্যাপারটি আসলে সুচিন্তিত পরিকল্পনার বিষয়। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে সরকার এগোলে নতুন বৈদেশিক শ্রমবাজার খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এতে দেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বেকারের যেমন কর্মসংস্থান হতে পারে, তেমনি রেমিট্যান্সের প্রবাহ ধরে রাখা বা বৃদ্ধির সম্ভাবনাও বাড়বে।