জাতীয় নির্বাচন ইস্যুতে সিদ্ধান্তে অটল অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। প্রধান উপদেষ্টার পদত্যাগের গুঞ্জনের পর উদ্ভূত রাজনৈতিক সংকট নিয়ে দেশব্যাপী জনমনে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছিল। সর্বোচ্চ আলোচনা ছিল বৈঠকে কী ঘটবে। এর আগে ইশরাক ইস্যুতে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ চেয়ে চার-পাঁচ দিনেও দেখা করতে পারেনি বিএনপি। বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে প্রধান উপদেষ্টার উপস্থিতিতে উপদেষ্টা পরিষদের এক অনির্ধারিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে বিবৃতিতে জানানো হয়, শত বাধার মাঝেও গোষ্ঠীস্বার্থকে উপেক্ষা করে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। যদি পরাজিত শক্তির ইন্ধনে এবং বিদেশি ষড়যন্ত্রের কারণে সরকারের ওপর আরোপিত দায়িত্ব পালন অসম্ভব হয়ে যায়, তবে সরকার জনসমক্ষে উত্থাপন করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। সরকার জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। দেশকে স্থিতিশীল রাখতে, নির্বাচন, বিচার ও সংস্কারকাজ এগিয়ে নিতে এবং চিরতরে এ দেশে স্বৈরাচারের আগমন প্রতিহত করতে বৃহত্তর ঐক্য প্রয়োজন বলে মনে করে উপদেষ্টা পরিষদ। এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য শুনবে এবং সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করবে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা তার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে জোর দিয়ে বলেছেন, ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রধান উপদেষ্টা গত শনিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রতিনিধিদের সঙ্গে তিনটি আলাদা বৈঠক করেছেন। বৈঠকে দলগুলো আলাদাভাবে তাদের প্রাধান্য তুলে ধরেছে। বিএনপি চায় দ্রুত নির্বাচন ও তিন উপদেষ্টার পদত্যাগ। জামায়াত চায় বিচার, সংস্কার ও নির্বাচনি রোডম্যাপ। এনসিপি গুরুত্ব দিয়েছে গণপরিষদ ও আওয়ামী লীগের নির্বাচন বাতিলের ওপর। তারা মনে করে, বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন- এই তিন বিষয়ে রোডম্যাপ (পথনকশা) একসঙ্গে প্রকাশ করা উচিত। তিনটি রোডম্যাপ যদি একসঙ্গে হয়, তাহলে জনমনে ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে স্বস্তি ও আস্থার জায়গা তৈরি হবে। এ ছাড়া গত রবিবার প্রধান উপদেষ্টা ২০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন, সংস্কার এবং চলমান রাজনৈতিক সংকট নিয়েও আলোচনা হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণার আহ্বান জানানো হয়।
বৈঠকের সূত্রমতে, একাধিক উপদেষ্টা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়েছেন। প্রয়োজনমতো আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে মত এসেছে। বর্তমানে যে সংকট চলছে, তা নিরসনে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর ঘনিষ্ঠতা ও যোগাযোগ বাড়ানো দরকার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দূরত্ব বাড়ার কারণে রাজনৈতিক দল এবং উপদেষ্টাদের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝির সৃষ্টি হচ্ছে। পদত্যাগ নয়, পরিস্থিতি মোকাবিলা করার পক্ষে মত দিয়েছেন উপদেষ্টারা। বিতর্কের জন্ম দেওয়া বিষয়গুলো নিয়ে আত্মসমালোচনা ছিল সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টাদের বক্তব্যে। জুলাই ঘোষণাপত্র নিয়ে আলোচনা ছিল বৈঠকে। বৈঠকে ২২ উপদেষ্টার মধ্যে ১৯ জন অংশ নেন। তারা মতামত দেন, দেশের সংকটময় পরিস্থিতিতে পদত্যাগ করলে বিশৃঙ্খলা ও অস্থিতিশীলতা বাড়বে। ফলে এর দায়ও ড. ইউনূসকে নিতে হবে। তারা দায়িত্ব পালনে সরকারকে কঠোর হওয়ার ওপর জোর দেন।
দেশের সংকটময় পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এ সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক। সরকার রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে সুনির্দিষ্ট নির্বাচনি রোডম্যাপ ও দিকনির্দেশনা দিয়ে জাতিকে একটি ভালো নির্বাচন উপহার দিতে সক্ষম হবে। সে জন্য একটি জাতীয় ঐকমত্য প্রয়োজন। আশা করছি, সরকার দেশের বৃহত্তর কল্যাণের কথা চিন্তা করে সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হবে।