বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে এবার তুলনামূলক ছোট বাজেট দিতে যাচ্ছে সরকার। লক্ষ্য হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ আজ ২ জুন টেলিভিশনের পর্দায় বাজেট ঘোষণা করবেন। সম্প্রতি তিনি সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, তার বাজেট হবে সমতাভিত্তিক ও জনকল্যাণমুখী। বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট দেবেন তিনি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে স্বচ্ছতা আনতে কর্মসূচিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। বাস্তবতার নিরিখে আসন্ন বাজেটে এ কর্মসূচি ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। মূলত নিম্ন আয়ের দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষকে সহায়তা দিতেই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করা হয়। কিন্তু বরাদ্দ এখনো যথেষ্ট নয়।
জিডিপির অনুপাতে এ খাতে বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে কম ব্যয় করে বাংলাদেশ। বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন বেশ কিছু সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এমন কিছু কর্মসূচি আছে, যেগুলো সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় পড়ে না- সেগুলোকেও আওতায় এনেছে বিগত সরকার। যেমন পেনশন সুবিধাকেও এক ধরনের সামাজিক সুরক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আবার সঞ্চয়পত্রের মুনাফাকে সামাজিক সুরক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ উন্নয়ন সহযোগীরা এ ধরনের কর্মসূচি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয় সরকার। এতে উপকারভোগীর সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ বাড়ানো হবে। তবে বিদ্যমান প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কর্মসূচি বাতিল হতে পারে। বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১৪০টি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নাধীন। নতুন বাজেটে এ কর্মসূচি কমিয়ে ১০০টি করা হচ্ছে। তবে হতদরিদ্রদের জন্য ৩৮টি আলাদা কর্মসূচি চালু করা হচ্ছে। এ ধরনের কর্মসূচির আওতায় ৫২ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে।
কর্মসূচির সংখ্যা কমিয়ে আনার ফলে নতুন বাজেটে এক খাতে বরাদ্দ আগের চেয়ে কমানোর প্রস্তাব করা হচ্ছে। বর্তমানে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় যে পরিমাণ বরাদ্দ দেওয়া আছে তা মোট বাজেটের ১৬ শতাংশ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, নতুন বাজেটে বরাদ্দ কমিয়ে মোট বাজেটের ১৩ শতাংশ নির্ধারণ করা হচ্ছে। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ ৯৬ হাজার কোটি টাকা। যা এখন আছে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। সূত্র জানায়, নতুন বাজেটে বয়স্ক, বিধবাসহ অন্য উপকারভোগীর মাসিক ভাতা বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে উপকারভোগীর সংখ্যা। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় বাড়ানো হচ্ছে। এখন সারা দেশে ৫০ লাখ দুস্থ পরিবারকে সাশ্রয়ী মূল্যে চাল দেওয়া হচ্ছে। এ সংখ্যা আরও ৫ লাখ বাড়ছে। এ ছাড়া বর্তমান সরকার তারুণ্যের শক্তিকে দেশের উন্নয়ন কাজে সম্পৃক্ত করতে চায়। সে জন্য তাদের আয় বৃদ্ধিমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য বিশেষ বরাদ্দে প্রস্তাব করা হচ্ছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। জিনিসপত্রের যে দাম বেড়েছে, বিশেষ করে নিত্যপণ্যের, তাতে নির্ধারিত ও স্বল্প আয়ের মানুষের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। তাদের স্বস্তি দিতে কী ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছেন অর্থ উপদেষ্টা তা দেখার জন্য অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছে দেশবাসী।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদারকরণে উপকারভোগী বাছাইয়ে স্বচ্ছতা আনতে হবে। এজন্য সরকারকে একটি সমন্বিত টেকসই সামাজিক সুরক্ষার দিকে এগোতে হবে। সত্যিকার উপকারভোগী চিহ্নিত করে তাদের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা না গেলে এটি সফলতার মুখ দেখবে না। আশা করছি, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সঠিক সংস্কার করে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।