ছুটির আমেজে মন্থর রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশ। অবসরে ও উৎসবে উপভোগ্য হয়ে উঠেছে ছুটির দিনগুলো। এ রকম চলবে আরও কয়েক দিন। এর পরই চিরচেনা রূপে পুরো মাত্রায় কর্মমুখর হয়ে উঠবে দেশ। ব্যস্ততা ফিরবে নগর-বন্দর-জনপদে। অফিসে-আদালতে কর্মক্ষেত্রে।
ঈদুল আজহার ছুটিতে অধিকাংশ মানুষের দিনগুলো কাটছে আত্মীয় আর বন্ধুবান্ধব পরিবেষ্টিত পরিবেশে। নগরে কাজ করা মানুষ ছুটে গেছেন গ্রামের বাড়িতে। গ্রামে যারা আছেন, নিকটজনদের কাছে পেয়ে উৎফুল্ল। ছুটি মানেই এ রকম মিলনমেলা। শহর-গ্রাম একাকার। ভোটের ক্ষীণ হাওয়া লেগেছে গ্রাম্য জনপদে। জনপ্রতিনিধি বা যারা জনপ্রতিনিধিত্বের আকাঙ্ক্ষা লালন করেন, তারা নিজের এলাকায় ছুটে গেছেন। এলাকায় স্থায়ী যারা, তারাও গণসংযোগ করেছেন। জনহিতকর কাজেও সম্পৃক্ত হয়েছেন অনেকে। ভাগাভাগি করে নিয়েছেন ঈদের আনন্দ। এর সবই আমাদের রাজনৈতিক-সামাজিক সংস্কৃতির ইতিবাচক দিক।
এ সম্পর্কিত একটা খবরের প্রতি অনেকেরই দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী ছুটিতে বন্ধ থাকা ক্যাম্পাসে বিপন্ন কুকুর-বিড়াল প্রাণীর খাবার এবং চিকিৎসাসেবা নিয়ে এগিয়ে এসেছেন। এই মহৎ কাজগুলোকে আপাতদৃষ্টিতে অকিঞ্চিৎকর ও অনুল্লেখযোগ্য মনে হলেও এতে মানবতাবোধেরই প্রকাশ ঘটেছে। আমরা এসব তরুণ-তরুণীকে সাধুবাদ দিই।
আমাদের পেশা ও কাজ যেমন বিচিত্র, তেমনি যাপনেরও নানারূপ আমরা লক্ষ করি। এর ভেতরে ঈদের দুই ছুটিতে অনেকেই শিকড়ের টানে ছুটে গেছেন গ্রামে। নানা দিক থেকে তখন ঢাকাসহ ক্ষতবিক্ষত জীর্ণ শহরগুলো প্রাণ ফিরে পেয়েছে। ছুটির কয়েকটা দিন ব্যস্ততা, যানজট, দূষণ ইত্যাদি থেকে মুক্ত থেকেছে। সম্প্রতি নানা দাবিকে কেন্দ্র করে ঢাকার জনজীবন যেভাবে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছিল, তা থেকেও মুক্তি পেয়েছে শহরটি। সড়কে অফিসগামী মানুষের উপস্থিতি নেই। হাতে গোনা অল্পকিছু গণপরিবহন চলছে। যাত্রী কম। নিজস্ব গাড়ি, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও সিএনজি অটোরিকশার চলাচলও কম। ফাঁকা রাস্তা, কম গাড়ি, চলাচলে স্বস্তি। রাজধানী কত শান্ত। জীবন এখন মন্থর কিন্তু সহজ সুন্দর। এ রকম মুহূর্তেই মনে পড়তে পারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই কবিতাটির কথা, ‘ধরণীর ’পরে শিথিলবাঁধন/ ঝলমল প্রাণ করিস যাপন।’
মানবজীবনে রবীন্দ্রনাথের মতো এই শিথিল যাপনের গুরুত্বের কথা বলে গেছেন দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলও। ‘আলস্যের জয়গান’ নামে একটি বইতে তিনি লিখেছেন, মানুষের জীবনে কাজ যেমন থাকবে, তেমনি অবসরে আলস্যে জীবনকে ভরিয়ে তুলতে হয়। সে রকম মুহূর্তে তিনি শুধু রবীন্দ্রনাথের মতো ‘শুধু অকারণ পুলকে/ ক্ষণিকের গান গা রে আজি প্রাণ/ ক্ষণিক দিনের আলোকে’র প্রতিধ্বনি করেননি তিনি। বলেছেন আরও গভীর কথা, ‘অবসর সামাজিক সম্পর্কগুলোকে সুন্দর ও সূক্ষ্মতর করে। অবসরভোগী শ্রেণি না থাকলে মানবতা বর্বরতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না।’ মানুষের আছে কাজ ও উপভোগ। সেই সূত্রে সে সরল সুখের অধিকারী হয়। পুঁজিবাদী সমাজ শ্রম, উৎপাদনশীলতা ও সম্পদ সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দিলেও এই অবসর ছাড়া মানুষ বাঁচে না। সভ্যতার অগ্রগতি রুদ্ধ হয়ে যায়। ‘সভ্যতার জন্য অবকাশ তাই অত্যন্ত জরুরি’, লিখেছেন রাসেল।
ঢাকা এখনো ফাঁকা। ঈদের ছুটির পর ঢাকায় ফিরতে শুরু করেছেন কর্মজীবী মানুষ। অবকাশের দিনগুলো শেষ হয়ে আসছে। আশা করা যায়, নতুনভাবে রাজধানীর মানুষ নতুন জীবনীশক্তি নিয়ে যার যার কাজে আবার ঝাঁপিয়ে পড়বেন। তবে আমাদের যদি উপলব্ধি হয়, এই শহর আমাদের, এই দেশ আমাদের; একে সুন্দর রাখা সবার দায়িত্ব, তাহলে অবকাশের মধ্য দিয়ে যে কল্যাণকামী রাষ্ট্রের কথা আমরা ভাবি, তা হয়তো গড়ে তোলা যাবে। যে তরুণরা কিছু প্রাণীর প্রাণ বাঁচানোর কাজ করেছেন, যে রাজনীতিবিদরা জনকল্যাণে নিবেদিত হয়েছেন, সবার সম্মিলিত চেষ্টায় গড়ে উঠবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ।