কোরবানির চামড়া নিয়ে নৈরাজ্য চলছেই। এবারও ব্যবসায়ীরা সরকারের বেঁধে দেওয়া ন্যায্যমূল্য পাননি। কোরবানির মৌসুমেই দেশের ৫০-৬০ শতাংশ চামড়া সংগৃহীত হয়। এই চামড়া সংগ্রহে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেন মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা। এদের চামড়া সংগ্রহের পরিমাণ মোট সংগ্রহের প্রায় ৮০ শতাংশ। কিন্তু সরকার চামড়ার যে মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে, সেই দামে বিক্রি করতে পারছেন না। অভিযোগ আছে, চামড়ার আড়তদার, ট্যানারিমালিক ও বড় ব্যবসায়ীরা চামড়ার দাম কমিয়ে রাখছেন। তারাই গড়ে তুলেছেন সিন্ডিকেট।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এবার অনেক এলাকায় চামড়া খালে-নদীতে ফেলে দেওয়া বা মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছে। এদিকে ট্যানারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, তারা সরকারনির্ধারিত দামে চামড়া কিনছেন। বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেছেন, বিগত এক দশকের মধ্যে এবার সবচেয়ে বেশি দামে চামড়া বিক্রি হয়েছে। বাণিজ্য উপদেষ্টার এ কথার সঙ্গে বাস্তবের মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি।
বাস্তবে দেখা গেছে, এ বছর ঢাকায় বেশির ভাগ গরুর কাঁচা চামড়া ৬০০ থেকে সর্বোচ্চ ৯০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে প্রতিটি ৫ থেকে ১০ টাকা দরে। গত বছরও ঢাকায় গরু ও ছাগলের কাঁচা চামড়ার দাম এ রকমই ছিল। ঢাকার বাইরে চামড়া আরও কম দামে বিক্রি হয়েছে। অনেকে চামড়া রাস্তায় ফেলে দিয়েছেন। অনেক জায়গায় চামড়া পচে নষ্ট হয়ে গেছে। বরিশালে বিক্রি হয়নি ছাগলের চামড়া। চট্টগ্রামে চামড়ার দাম ছিল আরও কম।
গত এক দশকে চামড়ার দাম এভাবেই ক্রমশ কমে অর্ধেক হয়ে গেছে।
চামড়া ব্যবসার সঙ্গে প্রধানত যুক্ত আছেন মাঝারি ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া কোরবানিদাতা, পাড়া-মহল্লার মৌসুমি ক্রেতা এবং মাদ্রাসা, মসজিদ, এতিমখানার পক্ষ থেকেও চামড়া সংগ্রহ করে বিক্রি করা হয়। মাঝারি ব্যবসায়ীরা সেই চামড়া কিনে ট্যানারিমালিকদের কাছে বিক্রি করেন। সিন্ডিকেটের যে অস্তিত্বের কথা বলা হয়, তা হলো এই মাঝারি ব্যবসায়ী এবং ট্যানারিমালিকদের সিন্ডিকেট।
মৌসুমি ব্যবসায়ীরা লবণহীন চামড়া কিনে বিক্রি করেন বলে সরকারি মূল্য পান না। আবার সরকার যে মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে, সেই দাম থেকেও চামড়া সংগ্রহকারীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। তা ছাড়া দাম নির্ধারণের পর ট্যানারি ব্যবসায়ী এবং আড়তদাররা সরকারনির্ধারিত দামে কেনাবেচা করছে কি না, সেই তদারকির ব্যবস্থাও নেই।
আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, চামড়াশিল্প পরিবেশদূষণমুক্ত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ আমাদের নেই। এই সনদ পাওয়ার শর্ত হিসেবে বিগত সরকার ঢাকার হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিগুলো সাভারের কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারে (সিইটিপি) সরিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু সিইটিপির চামড়াশিল্পের সব ধরনের বর্জ্য পূর্ণমাত্রায় পরিশোধনের সক্ষমতা নেই। প্রক্রিয়াজাত চামড়া ইউরোপের পরিবর্তে তাই চীনের বাজারে কম দামে রপ্তানি করতে হচ্ছে। বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশ। ধুঁকছে দেশের চামড়াশিল্প। হ্রাস পাচ্ছে কাঁচা চামড়ার মূল্য।
শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারাও চামড়াশিল্পের আরেক সমস্যা। এলডব্লিউজির সনদ পেতে হলে এই কর্মপরিবেশ নির্দিষ্ট মানে উন্নীত করতে হবে। সব মিলিয়ে চামড়াশিল্পের সমস্যা বহুমুখী। বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ জন্য প্রয়োজনীয় কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সরকার চামড়ার যে দর বেঁধে দেয়, তা থেকে সরে এসে বাজারের ওপর তা ছেড়ে দিতে হবে।
শিল্পমালিকদের সিইটিপির ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব বর্জ্য পরিশোধনাগার গড়ে তুলতে হবে। ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এটা গড়ে তুলেছে। শ্রমিকের পরিবেশ উন্নত করার ওপরও যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। এসব শর্ত পূরণ করা গেলেই পাওয়া যাবে এলডব্লিউজির সনদ। এই সনদের ওপরই নির্ভর করছে আমাদের চামড়াশিল্পের বিশ্ববাজারে প্রবেশাধিকারের বিষয়টি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গার্মেন্টশিল্পে আমাদের যে বৈশ্বিক সুনাম তৈরি হয়েছে, চামড়াশিল্পেও সেটা হতে পারে। কিন্তু এ জন্য প্রয়োজন উল্লিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা। বাংলাদেশ এখন পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকার চামড়াশিল্পের ইতিবাচক পরিবর্তনে কাজ করবে। এতে শুধু চামড়ার মূল্য বৃদ্ধি পাবে তাই নয়, বিশ্ববাজারে আমাদের চামড়াশিল্পের প্রবেশাধিকারও সুনিশ্চিত হবে বলে আমরা প্রত্যাশা করছি।