রোহিঙ্গাসংকট বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের একটি জটিল মানবিক ও নিরাপত্তাসংকট। মায়ানমারের রোহিঙ্গাদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নিপীড়ন ও তাদের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করার কারণে এ সংকট তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। মায়ানমারের জান্তা সরকারের নির্যাতন ও গণহত্যায় সে দেশ থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা হয়েছে অনেক। কিন্তু সংকট মোকাবিলায় চোখে পড়ার মতো তেমন কোনো সমাধান বা অগ্রগতি হয়নি। কূটনৈতিক সূত্রমতে, রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেওয়ার বিষয়টি চীন কখনোই চায়নি।
তাই ২০১৭ সালেও যখন মায়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের ঢল বাংলাদেশের দিকে আসে, তখন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক মহল বেশ সোচ্চার ছিল। কিন্তু চীন তখনো রোহিঙ্গা ইস্যুতে দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমাধানের ব্যাপারে সচেষ্ট ছিল। সার্বিক সহায়তার আশ্বাস দিয়ে এ সংকট সমাধানে জান্তা সরকারের সঙ্গে চুক্তি করতে বাংলাদেশ সরকারকে উৎসাহিত করেছিল। চীনের সেই আশ্বাসে দুই দেশের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে চুক্তি সম্পন্ন হলেও গত আট বছরে একজন রোহিঙ্গাও মায়ানমারে ফিরে যায়নি। এদিকে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির পর থেকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মহল দূরে সরে যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে মায়ানমারের রাখাইনে বাংলাদেশের ভেতর মানবিক করিডর ব্যবহার করে জাতিসংঘের ত্রাণসহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে অন্তর্বর্তী সরকার সরে আসার পর অনেকটা ভাটা পড়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন উদ্যোগ। এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা করতে উদ্যোগ নেয় চীন। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে আট বছর ধরে জান্তা সরকার ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে আলোচনার মধ্যস্থতা করে আসছে চীন। কিন্তু এই দীর্ঘ সময় রোহিঙ্গা ইস্যুতে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় জাতিসংঘের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ ও সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। আগামী সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক মহলের অংশগ্রহণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের উপায় নিয়ে বড় পরিসরে আলোচনার কথা রয়েছে। সেখানে চীনকে আমন্ত্রণ জানানো হবে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ সরকারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন বিষয়ক কমিশনার মিজানুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশে এখন প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থান করছে। এর মধ্যে খাদ্যসংকট ও নিরাপত্তার অভাবে নতুন করে প্রতিদিন বাংলাদেশে আসতে বাধ্য হচ্ছে তারা। মায়ানমারের রাখাইন থেকে নতুন করে যেসব রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, তাদের মধ্যে ১ লাখ ১৮ হাজারের রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করা হয়েছে। কিন্তু গত মে ও জুন মাসে জাতিসংঘের রেজিস্ট্রেশন বন্ধ থাকায় কত সংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই।
বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু চীন। তাদের সঙ্গে মায়ানমার সরকারেরও ভালো সম্পর্ক। চীন যদি আন্তরিকভাবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মধ্যস্থতা করে তাহলে তাদের ফেরত পাঠানো সহজ হবে। মায়ানমার সরকারও অনেক সময় রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে অস্বীকার করে। এ দেশে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বাংলাদেশের দুর্বল অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অর্থ সহায়তা দিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তাদের অর্থ সহায়তা কমিয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও তেমন সহায়তা করছে না বলে বাংলাদেশের একার পক্ষে এ চাপ সহ্য করা সম্ভব নয়।
আবার রোহিঙ্গারা এ দেশে সামাজিক অপরাধ সৃষ্টি করছে। মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানসহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে তারা। অনেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ছে। শুধু তা-ই নয়, তারা বিয়ে করে সামাজিকভাবে মিশে যাচ্ছে। আবার অনেকে অবৈধ উপায়ে বাংলাদেশি পাসপোর্ট সংগ্রহ করে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। সেখানেও তারা নানারকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ায় বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন জরুরি হয়ে পড়েছে। আশা করছি, সরকার রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে চীনসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা নিয়ে একটি সমাধানের উদ্যোগ নেবে।