গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলা নিয়ে রাজধানীবাসীর অভিযোগ অন্তহীন। দিন যায়, কিন্তু সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে বৃদ্ধি পেতে থাকে। ঢাকায় সড়কের তুলনায় যানবাহন বেশি। আদর্শ পরিস্থিতি হচ্ছে এ রকম- যেকোনো নগরীর মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ এলাকায় সড়ক থাকা দরকার। ঢাকায় সে তুলনায় আছে মাত্র ৭-৮ শতাংশ। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জনসংখ্যার চাপ এবং বেসরকারি গাড়ির আধিক্য ঢাকার সড়কগুলোকে আরও সংকুচিত করেছে।
গণপরিবহনসংকটের মূল কারণ অবশ্য নিহিত রয়েছে অন্যত্র। স্বার্থান্বেষীদের স্বার্থ রক্ষাই রাজধানীর গণপরিবহনব্যবস্থাকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলেছে। খবরের কাগজে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এই সংকট এবার আরও তীব্র হতে চলেছে।
রাজধানী ঢাকায় এখন বাস চলছে সাড়ে ৬ হাজারের বেশি। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্যানুসারে, ঢাকার সড়কে ৫ হাজার ৫৪২টি বাস চলাচলের অনুমোদন রয়েছে। এর বাইরে অনুমোদনহীনভাবে চলছে আরও ১ হাজার ৮০টি বাস। ইতোমধ্যে ঢাকার সড়কগুলো যানবাহনের চাপে যানজটে বিপর্যস্ত। এর সঙ্গে এখন যুক্ত হচ্ছে আরও আড়াই হাজারের মতো নতুন বাস।
জানা গেছে, রাজধানীতে বাস চলাচলের অনুমোদন দেওয়ার দায়িত্বে যারা রয়েছেন তারাই নতুন করে ২১টি বাস কোম্পানিকে ২৩টি রুটে আড়াই হাজার বাস চালানোর অনুমোদন (রুট পারমিট) দিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ সড়ক কর্তৃপক্ষের কিছু সদস্যকে ‘ম্যানেজ’ করে বেসরকারি বাস কোম্পানির প্রভাবশালী মালিকরা ওই সুযোগ নিয়েছেন। আপত্তি উঠেছিল এভাবে এই মুহূর্তে নতুন করে রুট পারমিট না দেওয়ার।
কিন্তু পরিবহনমালিকদের চাপে তা গ্রাহ্য করা হয়নি। অভিযোগ ওঠে, সরকারি সব প্রতিষ্ঠানকে পাশ কাটিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এই অনুমোদন দিয়েছে। ডিএমপিরই একজন কর্মকর্তা আপত্তি জানিয়ে বলেছিলেন, ঢাকার বাস রুটগুলোকে যৌক্তিক (র্যাশনালাইজ) সমন্বয় সাধন না করে রুট পারমিট দেওয়া সমীচীন হবে না। কিন্তু সেই আপত্তি অগ্রাহ্য করে নতুন রুট পারমিট এবং বাস নামানোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। রুট পারমিট ছাড়াই অবশ্য রাজধানীতে আগে থেকেই অনেক বাস চলছে। এক রুটের নামে অনুমোদন নিয়ে বাস চালানো হচ্ছে অন্য রুটে, এ রকম চলছে দীর্ঘদিন ধরে। অধিকাংশ বাসের রুট পারমিট আবার মেয়াদোত্তীর্ণও হয়ে গেছে। এ ছাড়া নগরবাসীর চোখের সামনে লক্কড়ঝক্কড় বাস তো চলছেই।
কিছুদিন আগে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছিলেন, ঢাকার সড়ক থেকে এসব পুরোনো বাস সরিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু এখনো রাজধানীবাসীর চোখে তা দৃশ্যমান হয়নি। সব মিলিয়ে ঢাকার গণপরিবহনে চলছে চরম নৈরাজ্য। পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসবে বলে মনে করা হলেও বাস্তবে কিছুই বদলায়নি। দিন দিন তা জটিল হচ্ছে। রাজধানীর সড়কে নতুন করে আড়াই হাজার বাস নামলে এই সংকট আরও তীব্রতর হবে, তাতে সন্দেহ নেই। ঢাকায় গণপরিবহনের অংশ হিসেবে বাসের সংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে, কিন্তু তার আগে ট্রাফিকব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা দরকার।
সেটা না করে বাসের সংখ্যা বাড়ালে নগরে চলাচলে স্বস্তি পাওয়া যাবে না। আমরা তাই মনে করি, অবিলম্বে বাস রুটের অনুমোদনের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা উচিত। অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে এমনিতেই ঢাকায় যানজটের মাত্রা ক্রমশ বাড়ছে, তার ওপরে এই সিদ্ধান্ত মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো এই মহানগরীর মুমূর্ষু দগদগে অবস্থাকে আরও দৃশ্যমান করে তুলবে। এই আশঙ্কা থেকেই আমরা মনে করি, রুট পারমিটের অনুমোদন বাতিল করে বিদ্যমান অবস্থার ভেতর থেকেই গণপরিবহনে শৃঙ্খলার সূচনা করা প্রয়োজন। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সব মহল বিবেচনায় নিয়ে সাধারণ নগরবাসীকে চলাচলবান্ধব রাজধানী উপহার দেবেন বলে আমরা আশা করছি।