শুরু থেকেই দেশের সচেতন মানুষ লক্ষ রাখছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কর্মকাণ্ডের দিকে। বিশেষ করে সংবিধান ও নির্বাচনি ব্যবস্থা নিয়ে কতদিনে কী ধরনের সংস্কার হয়, তাই নিয়ে সাধারণ মানুষের তীব্র কৌতূহল রয়েছে। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, সক্রিয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী মহলও এই সংস্কার সম্পর্কে আগ্রহী। কেননা, বর্তমান পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি অনুসারে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই সংস্কারের ওপর। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে এর সাফল্যের ওপর। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কাঙ্ক্ষিত শেষবিন্দুতে পৌঁছাবার।
তাদের সঙ্গে শুরু থেকেই আলোচনায় অংশ নিচ্ছে ছোট-বড় আমন্ত্রিত ২৮টি রাজনৈতিক দল ও দুটি জোট। রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রথম দফার বৈঠক শেষে দ্বিতীয় দফায় বৈঠক করছে।
গত অক্টোবরে ছয়টি কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। এসব কমিশনের মধ্যে জনপ্রশাসন ছাড়া বাকি পাঁচ কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবগুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। এই কমিশনের দায়িত্ব হচ্ছে রাজনৈতিক দলসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো এবং ‘জাতীয় সনদ’ প্রণয়ন করা।
প্রথম দফায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ২০ মার্চ থেকে ১৯ মে পর্যন্ত ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে ৪৫টি বৈঠক করে। তবে সংস্কার-প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক অনেক বিষয়ে দলগুলো একমত হতে পারেনি। এরপর সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শুরু হয় দ্বিতীয় দফার বৈঠক। গত ৭ জুলাই পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ১০টি বৈঠক করেছে।
প্রথম দফার বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়া মতামত বিবেচনায় নিয়ে দ্বিতীয় দফায় সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ২০টি মৌলিক বিষয় আলোচনার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আলোচিত ১৪টি বিষয়ের মধ্যে ঐকমত্য হলেও এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে আটটি বিষয়। এ ছাড়া অনালোচিত আরও ছয়টি বিষয়, যেমন প্রধানমন্ত্রীর কার্যকালের মেয়াদ ১০ বছর রাখা, প্রধান বিচারপতি নিয়োগ, সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোসহ বেশ কিছু বিষয়ে দলগুলো ঐক্যের কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে।
আশা করা হচ্ছে, চূড়ান্ত আলোচনা শেষে বেশির ভাগ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হতে পারবে। চলতি জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করার ব্যাপারে কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ আশাবাদী। দলগুলো অঙ্গীকারবদ্ধ যে তারা জাতীয় সনদে সই করবে। আমরা এখন পর্যন্ত যে অগ্রগতি হয়েছে তাকে স্বাগত জানাই। কমিশনের প্রচেষ্টাকে ইতিবাচকভাবে দেখছি। কিন্তু পথের শেষ আলোকবিন্দুটি এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি।
রাজনৈতিক দলগুলো দ্বিতীয় দফার বৈঠকে এ পর্যন্ত মাত্র ছয়টি বিষয়ে একমত হতে পেরেছে। বিষয়গুলো হচ্ছে সংবিধানের ৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতিত্ব, নির্বাচনি এলাকার সীমানা নির্ধারণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমা-সম্পর্কিত বিধান, বিচার বিভাগ বিকেন্দ্রীকরণ ও উপজেলা পর্যায়ে আদালত সম্প্রসারণ। তবে ছয়টি নতুন বিষয়সহ এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে আরও আটটি বিষয়।
ঐকমত্যে না পৌঁছানো সেসব বিষয় হচ্ছে রাষ্ট্রের মূলনীতি, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদকাল, প্রধান বিচারপতি নিয়োগ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ইলেকটোরাল কলেজ পদ্ধতি, সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ কমিটি (যার আগে প্রস্তাবিত নাম ছিল জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল- এনসিসি), দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট (উচ্চকক্ষের গঠন, সদস্য নির্বাচনের পদ্ধতি, এখতিয়ার ইত্যাদি) এবং সংসদে নারী আসন নির্ধারণ (সংখ্যা বৃদ্ধি, নির্বাচন পদ্ধতি ইত্যাদি)।
এ ছাড়া এখনো অন্তত ছয়টি মৌলিক বিষয়ে আলোচনা করতে পারেনি ঐকমত্য কমিশন। এই বিষয়গুলো হচ্ছে সংবিধান সংশোধন, প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে থাকার বিধান, সংসদ সদস্যদের একাধিক পদে থাকার বিধান, জরুরি অবস্থা ঘোষণা, নাগরিকের মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ-সম্পর্কিত প্রস্তাব, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব।
আমরা মনে করি, সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। রাজনৈতিক দলগুলোর আর এক সপ্তাহ বা দেড় সপ্তাহের মধ্যে ঐকমত্যে পৌঁছানো জরুরি। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জুলাইয়ের শেষ নাগাদ যেহেতু জাতীয় সনদ তৈরি করতে চায়, ফলে হাতে তেমন সময় নেই। সব বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হলে ভালো হতো, কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো ইতোমধ্যে তাদের মধ্যে সব বিষয়ে ঐকমত্য যে প্রতিষ্ঠিত হবে না, সে কথাও জানিয়ে দিয়েছে। কমিশনও এটা প্রত্যাশা করে না।
এটাই হচ্ছে বাস্তবোচিত অবস্থান। আমরা মনে করি, যেসব বিষয়ে একমত হওয়া গেছে, সেসব বিষয় নিয়েই জাতীয় সনদ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে আর অমীমাংসিত বিষয়গুলো সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নির্বাচনের পরেও নেওয়া যাবে। সংস্কার তো একটা চলমান প্রক্রিয়া।
জাতীয় ইস্যুতে ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হওয়াই এখন অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজেও তারই ইঙ্গিত দিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তিনি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। আমরাও প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সহমত প্রকাশ করে বলতে চাই, যেসব বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার ভিত্তিতে জাতীয় সনদ তৈরি করা যেতে পারে। দেশ বহু আকাঙ্ক্ষিত এই বড় ধাপটি পেরিয়ে জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাক।