নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে ঢাকায় জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনের মিশন চালু হতে যাচ্ছে। ঢাকায় এর একটি পূর্ণাঙ্গ কার্যালয় চালুর জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ও জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশন ২৮টি ধারাসংবলিত তিন বছর মেয়াদি সমঝোতা স্মারকে সই করেছে। জেনেভা থেকে জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বাংলাদেশের মানবাধিকার সুরক্ষা ও উন্নয়নের লক্ষ্যে চলতি সপ্তাহে চুক্তিটি সই হয়। এর আগে জাতিসংঘ ওএইচসিএইচআরের বাংলাদেশ মিশন স্থাপনে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় উপদেষ্টা পরিষদ। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের ৩৩তম সভায় এই অনুমোদন দেওয়া হয়। এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত বছরের আগস্ট থেকে বাংলাদেশ ও জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনের মধ্যে সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
মানবাধিকার রক্ষায় চলমান সংস্থার এবং অতীতে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনা তদন্তে জাতিসংঘ একটি সমন্বিত তথ্যানুসন্ধান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক বলেন, চলমান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে মানবাধিকারকে মূল ভিত্তি হিসেবে নিয়েছে, এই সমঝোতা স্মারক সেটারই গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। এর ফলে আমাদের কার্যালয় আগের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে আরও কার্যকরভাবে সহযোগিতা করতে পারবে। একই সঙ্গে এটি সরকারের সঙ্গে নাগরিক সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের সরাসরি যুক্ত হয়ে কাজ করার সুযোগ করে দেবে।
বাংলাদেশসহ ৪৩টি দেশে এ কার্যালয় স্থাপনের জন্য প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে সংস্থাটি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেসব দেশে এর কার্যালয় খোলা হয়েছে বা খুলতে অনুরোধ করেছে, এর সবই পশ্চিমা জোটের বিপরীত শক্তি অথবা অনুন্নত দেশ। কান্ট্রি অফিস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে মানবাধিকার সুরক্ষা ও প্রসারে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে দেনদরবার করে থাকে জাতিসংঘ। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের কার্যালয় প্রতিষ্ঠার চুক্তি স্বাক্ষরের আগে আরও চিন্তাভাবনার দরকার ছিল।
এতে দেশ ভাবমূর্তি সংকটে পড়তে পারে। বিদেশি বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীরা ভাবতে পারেন জাতিসংঘের এ ধরনের অফিস থাকা মানেই দেশটিতে অস্থিতিশীলতা বা অভ্যন্তরীণ কোনো ঝামেলা আছে। কারণ জাতিসংঘের এ ধরনের কার্যালয় যেসব দেশে আছে, সেখানেই ভাবমূর্তি সংকট হয়েছে। সেসব দেশের মতো সংকটাপন্ন দেশ বাংলাদেশ নয়। এশিয়ার কোনো দেশে জাতিসংঘের এই কার্যালয় নেই। কাজেই তারা বাংলাদেশে কতটা কাজ করতে পারবে তা সময়ই বলে দেবে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবীর খবরের কাগজকে বলেন, মানবাধিকার বিষয়ে তারা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে মিলে কাজ করবে। জাতিসংঘের এই কার্যালয়টি বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক নাগরিক অধিকারসহ অন্যান্য অধিকার রক্ষায় সহযোগিতা এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করবে। তারা মানবাধিকার রক্ষায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা দেবে, যা আমাদের জন্য দরকার। জাতিসংঘের এই কার্যালয়ের কাজের যে ধরন, তাতে রাজনৈতিক বিতর্কের কোনো কারণ নেই। যেহেতু তারা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করবে, তাই তারা কীভাবে কাজ করবে সেটা গুরুত্বপূর্ণ।
দেশে বেশ কিছুদিন ধরে চলছে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো কিছু ঘটনা। দেশের ঠিক সেই ক্রান্তিকালে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের কার্যালয় স্থাপনের বিষয়টি বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দেখা গেছে যেসব দেশে এ কার্যালয় স্থাপিত হয়েছে, সেখানকার মানবাধিকার পরিস্থিতি খুবই লাজুক অবস্থায় রয়েছে। তাদের অবস্থার উন্নয়ন এখনো সম্ভব হয়নি। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশে এটি কতটুকু কার্যকারিতা বা সফলতা বয়ে আনবে তা সময়ই বলে দেবে। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারকে দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিজেদের মোকাবিলা করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েই জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করতে হবে। দেশের স্বার্থ বিঘ্নিত হতে পারে- এমন কোনো কাজ করা যাবে না। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রশ্নে সরকার কোনো আপস করবে না, এটাই প্রত্যাশা।