সাদা পাথর প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট একটি পর্যটন কেন্দ্র। ২০১৭ সালে পাহাড়ি ঢলে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ পাথরমহালের ধলাই নদের উৎসমুখে পাঁচ একর জায়গাজুড়ে জমা হয় পাথর। ঢলের তোড়ে সেখানে সর্বশেষ ১৯৯০ সালে পাথর জমা হয়েছিল। তবে পাহাড়ি ঢলের পর লুটপাটে সেখানে পাথর নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ২৭ বছরের মাথায় ফের পাথর জমা হওয়ায় উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের পাহারায় তা সংরক্ষিত হয়।
ওই বছর থেকে পুরো এলাকাটি প্রাকৃতিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়। বর্তমানে সেই সাদা পাথর পর্যটন স্পট এখন আর আগের চেহারায় নেই। পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে পাথরস্তূপ রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্কতামূলক কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় পাথর লুটপাটের ঘটনাকে ‘মব মচ্ছব’ বলছেন পর্যটকরা। গত এক সপ্তাহে সরেজমিনে সেখানকার চিত্র খবরের কাগজ-এর কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। গত ৯ আগস্ট খবরের কাগজের প্রিন্ট ও অনলাইন সংস্করণে সাদা পাথরের সর্বনাশ গত বছরের ১২ অক্টোবর ‘সাদা পাথরে লুটের আঁচড়’ ও ২০ অক্টোবর ‘ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে বাঙ্কারের পাথর সাবাড়’ শিরোনামে দুটি সরেজমিন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর ৯ আগস্ট খবরের কাগজের প্রিন্ট ও অনলাইন সংস্করণে ‘মব মচ্ছবে সাদা পাথরের সর্বনাশ’ শিরোনামে সরেজমিন প্রতিবেদন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এরপর সাদা পাথর ইস্যুতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ করা শুরু হয়।
বৃষ্টিবহুল চেরাপুঞ্জি থেকে বর্ষায় ঢলের পানির সঙ্গে পাহাড় থেকে পাথরখণ্ড এপারে নেমে আসে। ভেসে আসা এই পাথর উত্তোলিত বা আমদানি করা পাথরের চেয়ে দামি। এটির কদরও বেশি। ব্যবহৃত হয় স্থাপত্য কাজে। সাদা পাথর এলাকায় যন্ত্র দিয়ে বালু ও মাটি সরিয়ে পাথর লুট হচ্ছে। এতে করে পর্যটকদের জন্য সাদা পাথর এলাকা আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। চোরাবালির সৃষ্টি হওয়ায় এলাকাটি মরণফাঁধে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, পাহাড়ি ঢল নেমে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পর্যটকরা সাদা পাথর এলাকায় যাচ্ছেন না। এই সুযোগে চলে লুটপাট।
গত এক সপ্তাহে দিন ও রাতে হাজারখানেক বারকি নৌকা ব্যবহার করে পাথর লুট হয়। অনেকটা মব স্টাইলে হওয়ায় ভয়ে পুলিশ প্রশাসনও ছিল সাক্ষী গোপালের ভূমিকায়। এমন পরিস্থিতিতে সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া পুলিশের একার পক্ষেও কিছু করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রথম দফা লুটপাটের আঁচড় লাগে সাদা পাথরে। এরপর প্রশাসনের দেখভালের অভাবে বছরব্যাপী চলছে লুটপাট।
সর্বশেষ গত এক মাসে সাবাড় হয় কয়েক স্তর পাথর। সাদা পাথর এলাকার পাথর সাবাড় করতে গিয়ে লুটেরা চক্র ধলাই নদের উৎসমুখ দ্বিখণ্ডিত করে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদের উৎসমুখ খণ্ডিত হওয়া শুধু প্রকৃতির জন্য বিপর্যয়কর নয় বরং ভয়ংকর বলে মনে করছেন তারা। এর ফলে নদীভাঙন, নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন, ভূমিধস, বন্যা সৃষ্টি হবে। পরিবেশ-প্রকৃতি ধ্বংস হলে মানুষের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হলে তা মানুষের ওপরই গিয়ে পড়বে।
আমরা এখন যা প্রত্যক্ষ করছি তা হলো সাদা পাথরের পর্যটন এলাকাটি আজ দানবের ভয়ে মানবশূন্য হয়ে পড়েছে। সিলেটের ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক দলের নেতারা সব সময় পাথর উত্তোলনের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন। পরিবেশকর্মীরা বলছেন, রাজনীতিবিদদের এ অবস্থান পাথর লুটে উৎসাহ দিয়েছে। লুটপাটের পর নেতারা অবশ্য বলছেন, তারা লুটের পক্ষে নন। তারা সব অভিযোগই অস্বীকার করছেন। বিগত পাঁচ বছরে তারা নানাভাবে পাথর কোয়ারি ইজারা আবার চালুর চেষ্টা করেছেন।
গত ২৭ এপ্রিল দেশের ৫১টির মধ্যে ১৭টি কোয়ারির ইজারা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এর মধ্যে ৮টি সিলেটের। তবে সংরক্ষিত এলাকা, পর্যটন কেন্দ্র ও কোয়ারিগুলোর পাথর একসঙ্গে লুট করে নেওয়া ঠেকানো যায়নি। পাথর লুটের সময় স্থানীয় প্রশাসন কিছু অভিযান চালালেও বিভিন্ন সময়ে তাদের ওপর বাধা ও হামলার ঘটনাও ঘটেছে। প্রকৃত দোষীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পাথর লুটের ঘটনা তদন্তে সমন্বিত টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। জড়িতদের আইনের আওতায় এনে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে অচিরেই হারিয়ে যাবে এ দেশের অসংখ্য প্রাকৃতিক সম্পদ। ধ্বংস হবে পর্যটন কেন্দ্রগুলো।