পূর্বঘোষণা অনুযায়ী আগামী ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু গত সোমবার হঠাৎ এই নির্বাচনকে ঘিরে একধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। একটা রিটের প্রেক্ষাপটে হাইকোর্ট ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত নির্বাচন স্থগিত করে দেন। এই আদেশ নিয়ে পুরো ক্যাম্পাসে মুহূর্তের মধ্যে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন সংগঠনের প্যানেল ও শিক্ষার্থীরা হাইকোর্টের এই স্থগিতাদেশের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে দায়ী করে কোনো অবস্থাতেই নির্বাচন পেছানো যাবে না বলে বিক্ষোভ করতে থাকেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও প্রায় সঙ্গে সঙ্গে হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত চেয়ে চেম্বার আদালতে আবেদন করে। হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ স্থগিত করে দেন চেম্বার আদালত। আর এই রায়ে ক্যাম্পাসে স্বস্তি ফিরে আসে।
চেম্বার আদালতের রায়ের ফলে এখন নির্ধারিত দিনেই নির্বাচন হতে যাচ্ছে। তবে বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থীরা কয়েক দিন ধরে সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে যেসব দাবি জানিয়ে আসছিলেন, সেই দাবিগুলো সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ফলে এই নির্বাচনকে অভিযোগমুক্ত আর সর্বাঙ্গীণ সুন্দর করে তোলার জন্য আরও অনেক কিছু করতে হবে।
ছাত্ররাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হচ্ছে ডাকসু নির্বাচন। অতীতে জাতীয় যেসব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে, ডাকসুকে দেখা গেছে সেসব ঘটনার অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দিতে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডাকসু নেতৃত্বই প্রাথমিকভাবে জাতীয় আন্দোলনের সূচনা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ছাত্র নেতৃত্বকে দেখা যাবে আগামীতে জাতিকে নেতৃত্ব দিতে।
ডাকসু নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম। নির্বাচনটি তাই সর্বাঙ্গীণ সুন্দর হওয়া জরুরি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, বেশ কয়েকটি প্যানেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের বিরুদ্ধে নির্বাচনে অব্যবস্থা ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলেছে। সোমবার ছাত্রদল-সমর্থিত প্যানেলের সহসভাপতি (ভিপি) প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নির্বাচন বন্ধের ফাকফোকর রেখেছে। তাদের একের পর এক ব্যর্থতার কারণে হাইকোর্ট নির্বাচন স্থগিত করতে পেরেছেন। ছাত্রদল বলেছে, ঢাবি প্রশাসনকে ছাত্রদল কিছু বিষয়ে স্পষ্ট প্রমাণসহ অভিযোগ দিয়েছে, কিন্তু তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
ওই দিনই ডাকসু স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য প্যানেলের ভিপি (সহসভাপতি) প্রার্থী উমামা ফাতেমা অভিযোগ করেছেন, একটি শক্তি নানা উপায়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অস্থিতিশীল করে ডাকসু নির্বাচনকে বন্ধের চেষ্টা করছে। এর আগে তিনি বলেছিলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘনের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, তারা তা নিচ্ছে না। প্রশাসনের এ ধরনের উদাসীনতার ফলে নির্বাচনের দিন বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে।
‘প্রতিরোধ পর্ষদ’ প্যানেলের জিএস প্রার্থী মেঘমল্লার বসুও কয়েক দিন আগে ‘ভোটের বিষয়টি যদি স্ক্যাম (জালজালিয়াতি) মনে হয়, তাহলে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে’ পারেন বলে জানিয়েছিলেন। আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে ঢাবি প্রশাসনকে ‘বারবার বলা হলেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি’ বলে অভিযোগ করেন তিনি। এই একই অভিযোগ করেছেন ‘বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী আবদুল কাদের।
এসব অভিযোগের পাশাপাশি ডাকসু নির্বাচনকেন্দ্রিক দুটি ঘটনা গণমাধ্যমে উঠে আসার পর বিরূপ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রুমমেটকে ছুরিকাঘাতের অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র ভিপি প্রার্থী জালাল আহমদ জালালকে হল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। আরেকটি ঘটনা ঘটেছে সোমবার। ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেলের জিএস প্রার্থী এস এম ফরহাদের প্রার্থিতা চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদনকারী ছাত্রীকে ‘গণধর্ষণের’ হুমকি দিয়েছেন এক শিক্ষার্থী। এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন ডাকসুর ভিপি প্রার্থী ও গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের নেতা আবদুল কাদের। সম্মিলিতভাবে সাইবার বুলিং করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন প্রার্থী। ভোটারের তুলনায় বুথের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়েও দাবি জানিয়েছেন অনেকে।
স্বাভাবিকভাবেই উল্লিখিত ঘটনা ও অভিযোগে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ঢাবি ক্যাম্পাস। নষ্ট হচ্ছে নির্বাচনি পরিবেশ। আমরা মনে করি, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঢাবি প্রশাসন এবং ডাকসু নির্বাচন কমিশনকে অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে দ্রুত প্রতিকারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। তারা আইনি দিকগুলো আইনিভাবে সমাধান করবেন; পাশাপাশি প্রার্থীরা যেসব অভিযোগ করেছেন, সেই অভিযোগগুলো নিরসনের এখতিয়ার তো ঢাবি প্রশাসনের। বিলম্বে তাদের সামান্য গাফিলতিও বড় হয়ে উঠতে পারে। আমরা আশা করি, ঢাবি প্রশাসন সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে নির্বাচনকে বিতর্কমুক্ত, উৎসবমুখর, সুষ্ঠু করে তুলবে।