আরাকান আর্মি এবং রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হাতে ভারী অস্ত্র; যা এখন বাংলাদেশের জন্য চরম হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, গোটা পরিস্থিতি এক ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক শক্তির মদদে আরাকান আর্মি সীমান্তবর্তী পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রভাব বিস্তার করছে। অস্ত্র ও মাদক ব্যবসায় জড়িয়েছে বিদ্রোহীদের অনেকে। সীমান্ত সুরক্ষায় শিগগিরই সব বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ইতোমধ্যে রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির ওপর হামলা চালাচ্ছে এবং সীমান্তসংলগ্ন মায়ানমারের অভ্যন্তরের ক্যাম্পগুলোতে যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। বিদ্রোহ আরও তীব্র হলে তা সাধারণ রোহিঙ্গা, আরাকান আর্মি, বাংলাদেশসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। এতে রাখাইন রাজ্যের বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ ও রোহিঙ্গা মুসলিম সংখ্যালঘুর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ঝুঁকি আরও বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। প্রাণ বাঁচাতে আরও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার শঙ্কাও বেড়ে যেতে পারে।
খবরের কাগজের সরেজমিন তথ্যমতে, সম্প্রতি বাংলাদেশ সীমান্তলাগোয়া মায়ানমারের অভ্যন্তরে সীমান্ত পিলার ৫২-৫৩-এর বিপরীতে পাহাড় চান্দা এলাকায় রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) প্রশিক্ষণ ক্যাম্প রয়েছে। সেখানে রোহিঙ্গা তরুণদের দেওয়া হচ্ছে অস্ত্র প্রশিক্ষণ। ডামি অস্ত্র হাতে শত শত রোহিঙ্গা তরুণ প্রশিক্ষণ নিচ্ছে পাহাড় চান্দা প্যারেডে, যা অনেকটাই সামরিক প্রশিক্ষণের মতো। আরএসওর এক জ্যেষ্ঠ কমান্ডার খবরের কাগজের প্রতিবেদককে বলেন, রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে প্রতারণা করেছে আরাকান আর্মি। রাখাইনে নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে আমাদের জাতির সব সদস্য ভিটেমাটি ফিরে পাবে বলে আমরা তাদের পক্ষে ছিলাম, সহযোগিতাও করেছি। কিন্তু যখন রাখাইনে তারা এল, তখন ভোল পাল্টে তারাও জান্তার মতো রোহিঙ্গা জাতির ওপর নির্যাতন শুরু করল। তাই এখন আমাদের লড়াই তাদের সঙ্গে। যতদিন রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠী তাদের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে আরাকানে ফিরতে না পারবে, ততদিন আরএসওর লড়াই অব্যাহত থাকবে।
বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্ত এলাকায় মায়ানমারের অভ্যন্তরে চলা সংঘাতের কারণে মাইন বিস্ফোরণ একটি নিত্যনৈমিক্তিক ঘটনা। সম্প্রতি সেখানে মাইন বিস্ফোরণে একজন টহলরত বিজিবি সদস্যও মারা গেছেন। এতে করে সাধারণ মানুষ সেখানে খুবই আতঙ্কগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে স্থলে মাইন পুঁতে রাখার জন্য আরাকান আর্মিকে দুষছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর ইমদাদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, সব বিদ্রোহী গোষ্ঠীই আমাদের জন্য হুমকি। তাদের বহরে নতুন নতুন অস্ত্র যোগ হচ্ছে। এসব অস্ত্রই একদিন বাংলাদেশের দিকে তাক করতে পারে। তবে সেটা বেশি দূর যেতে পারবে না। কৌশলে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে বাংলাদেশকে। রাখাইনে আরাকান আর্মির সঙ্গে জান্তা বাহিনীর সংঘর্ষ বাড়বে। এতে সেখানকার পরিস্থিতি ঘোলাটে হবে। সীমান্ত নিরাপত্তায় সতর্ক থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
আরাকান আর্মির অনুপ্রবেশ ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হাতে ভারী অস্ত্র, যা বাংলাদেশের জন্য মোটেও ভালো ইঙ্গিত নয়। আবার সীমান্তের ওপারে থেকে যারা আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে, তাদের ওপরও সতর্কতামূলক দৃষ্টি রাখতে হবে। রোহিঙ্গাদের চারটি বিদ্রোহী গ্রুপ আরাকান আর্মিকে প্রতিরোধের ঘোষণা দিয়েছে। আর এ জন্য নতুন করে রোহিঙ্গাদের হাতে দেখা গেছে বিদেশি ভারী অস্ত্র। রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা যাতে সীমান্তে পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে না পারে, সেদিকে বিজিবি সদস্যদের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আমরা সবার আগে চাই সীমান্ত সুরক্ষা। সশস্ত্র রোহিঙ্গা বিদ্রোহী গোষ্ঠীর কাছে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব যাতে চ্যালেঞ্জের মুখে না পড়ে, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা সব দেশপ্রেমিক নাগরিকের অবশ্যকর্তব্য বলে মনে করি।