বাংলাদেশের ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান ‘রিউমর স্ক্যানার’ চলতি বছরের প্রথমার্ধে গত জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৬ মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ১ হাজার ৩৮০টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে একক ব্যক্তি হিসেবে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্যের শিকার হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্যের শিকার হয়েছে সরকারি দল আওয়ামী লীগ।
গত ৬ মাসে রিউমর স্ক্যানারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য জানা গেছে। ২০২৩ সালের প্রথম ৬ মাসে রিউমর স্ক্যানার ভুল তথ্য শনাক্ত করেছিল ৮৫৬টি। অর্থাৎ গত বছরের প্রথম ৬ মাসের তুলনায় এ বছর ৬১ শতাংশ বেশি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন, নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক নানা ঘটনা এবং খেলাধুলাসহ বিভিন্ন বিষয়ের কারণে ২০২৪ সালের প্রথম ৬ মাসে ভুল তথ্য প্রচারের হার বেড়েছে।
রিউমর স্ক্যানার আওয়ামী লীগ, এর বিভিন্ন সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন এবং নেতা-কর্মীদের নামে ২০২৪ সালের প্রথম ৬ মাসে ২১৬টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে, যা একই সময়ে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর নামে শনাক্ত করা ভুল তথ্যের দ্বিগুণের বেশি। শনাক্ত হওয়া ভুল তথ্যগুলোর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়িয়েছে ফেসবুকে। গত জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৬ মাসে ফেসবুকে মোট ১ হাজার ১১টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে। এই সময়ে ইউটিউবে ৩৬৪টি এবং টিকটকে ৩৬০টি ভিডিওর মাধ্যমে ভুল তথ্য ছড়ানো হয় বলে শনাক্ত করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
এ ছাড়া চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে গণমাধ্যমও ভুল তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। এই সময়ে দেশের গণমাধ্যমগুলোতে ভুল তথ্য, ছবি এবং ভিডিও সংবলিত ভুল তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে ৭৮টি। রিউমর স্ক্যানার এ বিষয়ে শিগগিরই বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করবে বলে জানিয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চে ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে ৬৫৪টি। আর পরের বা দ্বিতীয় কোয়ার্টার অর্থ্যাৎ এপ্রিল থেকে জুনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২৬টিতে। এক কথায় প্রথম প্রান্তিক থেকে দ্বিতীয় প্রান্তিকে ভুল তথ্য ছড়ানোর পরিমাণ ১১ শতাংশ বেড়েছে।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় গত ৭ জানুয়ারি। জাতীয় নির্বাচনকে সামনে গত বছর থেকেই ভুল তথ্য প্রচারের বিষয়টি লক্ষ্য করে রিউমর স্ক্যানার। নির্বাচনকে জড়িয়ে ২০২৩ সালে ৩২০টি ভুল তথ্য ছড়ানোর তথ্য দিয়েছিল রিউমর স্ক্যানার।
চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্যগুলোর সবচেয়ে বেশি শিকার হয়েছে সরকারি দল আওয়ামী লীগ। দলটির বিভিন্ন সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন এবং নেতা-কর্মীদের নামেও ৬ মাসে ২১৬টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এই সময়ে প্রধানমন্ত্রী এবং দলটির সভাপতি শেখ হাসিনাকে জড়িয়ে রাজনৈতিক বিষয়ে ৮১টি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়। এই তালিকায় পরের অবস্থানে রয়েছেন দলটির সহযোগী সংগঠন যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির অব্যাহতিপ্রাপ্ত আইন সম্পাদক ও হবিগঞ্জ-৪ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন, যার নামে ভুল তথ্য ৪২টি। তা ছাড়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে নিয়ে ২২টি, মাগুরা-১ আসনের সংসদ সদস্য ও ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে নিয়ে ১৬টি, প্রধানমন্ত্রীর আইসিটিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়কে নিয়ে ১২টি এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে ৩টি ভুল তথ্য প্রচারের প্রমাণ পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার।
আওয়ামী লীগের পর সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্যের শিকার হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটিকে জড়িয়ে প্রচার হওয়া ৭৪টি ভুল তথ্যের মধ্যে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নামেই সবচেয়ে ২২টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে। আর দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামে ১০টি, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে ৮টি, কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক রুমিন ফারহানার নামে ৫টি, প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে জড়িয়ে ৩টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার।
এ ছাড়া রিউমর স্ক্যানার চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে দেশের সশস্ত্র এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিয়ে ৬৭টি ভুল তথ্য প্রচারের প্রমাণ পেয়েছে। যার মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং বাহিনীর সাবেক প্রধান জেনারেল (অব.) এস এম শফিউদ্দিন আহমেদকে নিয়ে সর্বোচ্চ ২৭টি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে। তা ছাড়া বাংলাদেশ পুলিশকে নিয়ে ২৩টি, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখার প্রধান হারুন অর রশিদকে নিয়ে ৩টি, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে (র্যাব) নিয়ে ৪টি, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) নিয়ে ৩টি, বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে নিয়ে ২টি এবং জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা ও বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীকে নিয়ে ১টি করে ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
আর স্থাপনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্যের শিকার হয়েছে ঢাকার মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু টানেল, পদ্মা সেতু ও বঙ্গবন্ধু সেতু। তা ছাড়া জাতীয় সংসদকে নিয়ে ২৪টি, নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) নিয়ে ৪টি, বাংলাদেশ রেলওয়েকে নিয়ে ৭টি, ভূমি মন্ত্রণালয়কে নিয়ে ২টিসহ বাংলাদেশ ব্যাংকক, সুপ্রিম কোর্ট, বাংলাদেশ সচিবালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, বিমান বাংলাদেশ নিয়ে একটি করে ভুল তথ্যের প্রমাণ পেয়েছে সংস্থাটি। এসব প্রতিষ্ঠানসহ দেশের একাধিক সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং সরকারি বেসরকারি হাসপাতালের নামে ভুল তথ্য প্রচার হয়েছে। এমনকি বিদেশি সংস্থা জাতিসংঘ, ইউনেসকো, ইউনিসেফ, বিশ্বব্যাংক, জাইকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ওআইসির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও ভুল তথ্যের শিকার হয়েছে বলে শনাক্ত করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
রিউমর স্ক্যানারের পর্যবেক্ষণে ২০২৪ সালের প্রথম ৬ মাসে ইসলাম ধর্মকে জড়িয়ে ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে ৩৯টি। মুসলিমদের প্রধান উৎসব ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে ২৩টি ও রমজানকে কেন্দ্র করে ২৫টি। একই সময়ে হিন্দু ধর্মকে নিয়ে ৩০টি এবং বৌদ্ধ ধর্মকে নিয়ে ১টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির পর্যবেক্ষণে ২০২৪ সালের প্রথম ৬ মাসে এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে ১০টি, এইচএসসি নিয়ে ৬টি, জেএসসি ২টি এবং পিইসি নিয়ে ১টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে। এই সময়ে দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে প্রচারিত ২২টি ভুল তথ্য শনাক্ত করা হয়। একই সময়ে প্রশ্ন ফাঁস বিষয়ে ৫টি, মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে ৪টি এবং গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে ২টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে।
রিউমর স্ক্যানার পর্যবেক্ষণে গত ৬ মাসে ১৭ জন ব্যক্তিত্ব নিজেদের বক্তব্যে, ফেসবুক পোস্টে কিংবা এক্স পোস্টের মাধ্যমে ভুল তথ্য ছড়িয়েছেন। এদের মধ্যে ১৩ জন ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে, দুজন নিজেদের বক্তব্যে, একজন এক্স পোস্টে এবং একজন ফেসবুক অ্যাকাউন্টের স্টোরিতে ভুল তথ্য শেয়ার করেছেন। প্রযুক্তির অপব্যবহার আর গণমাধ্যমকে জড়িয়ে ভুল তথ্য বাড়ছে বলেও পর্যবেক্ষণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।