আবেগ হচ্ছে অনুভুতির উৎস। নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত আমাদের দেশে মানুষের আবেগের বিকাশ নিয়ে কেউ খুব একটা চিন্তিত হতো না। এতে দেখা গেল একটা জেনারেশন তৈরি হলো যারা সামাজিক ও অন্যান্য কাজে যথেষ্ট পিছিয়ে আছে। অর্থাৎ আবেগের বিকাশের সঙ্গে সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। শিশুরা মানসিকভাবে শান্ত থাকলে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ঘটে সুচারুভাবে। আবার সমাজের প্রতি তাদের দায়িত্ব পালনের পদ্ধতি বদলে যায়। এতে ব্যক্তিজীবনে সে যেমন সুখী হয়, সমাজও একজন আদর্শ নাগরিক পায়।
প্রথম দিকে শিশু অস্বস্তি প্রকাশ করে কান্নার মাধ্যমে, পরে ধীরে ধীরে বিভিন্ন ধরনের আবেগ শিখতে থাকে। আবেগের এই বিকাশে মা-বাবার অনেক অবদান থাকে। কীভাবে মা-বাবা শিশুর আবেগের বিকাশ ঘটিয়ে থাকেন, তা জানা থাকলে তারা আরও ভালোভাবে শিশুর আবেগের বিকাশ ঘটাতে পারবেন। আসুন, জেনে নিই প্রথম থেকেই শিশুর আবেগের বিকাশ কীভাবে ঘটানো যায়।
শিশুর মেজাজ অনুযায়ী আচরণ করুন
সব শিশু এক রকম হয় না। জন্ম থেকেই শিশুদের মেজাজ আলাদা হয়। আবার শিশুর মনের ভাব সব সময় একই রকম থাকে না। তাই বাবা-মাকেই নবজাতক শিশুর মেজাজ অনুযায়ী আচরণ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে লক্ষ রাখতে হয়, কোন আচরণ শিশুর জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী। যেমন- সামাজিক মানসিকতাসম্পন্ন একটি শিশুর খেলার সময় বেশি প্রয়োজন হয়। আবার তুলনামূলক চুপচাপ শিশুর মা-বাবা অনেক বেশি সক্রিয়, কর্মশক্তিপূর্ণ হলে শিশুটির সামনে কিছুটা ধীরস্থির আচরণ করতে হয়। তাহলে সে নিজেকে অযোগ্য বা নিঃসঙ্গ মনে করবে না।
ভালো আবেগীয় বন্ধন গড়ে তুলন
শিশুকে ছোট বয়স থেকে যথেষ্ট যত্নের সঙ্গে পালন করুন। নিজের ক্লান্তি, হতাশা, রাগ এসব যথাসম্ভব শিশুর সামনে কম প্রকাশ করে শিশুর আবেগ অভিভাবকদের সামনে প্রকাশ করার সহযোগী পরিবেশ তৈরি করতে হবে। শিশু কোনো ধরনের আবেগ প্রকাশ করতে যেন অস্বস্তি বোধ না করে। লালন-পালনকারী ও বাবা-মায়ের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক থাকলে শিশু নতুন নতুন জিনিস সম্পর্কে সহজে প্রশ্ন করে, নিজে নিজে শিখতে চেষ্টা করে অথবা নিজের মন শান্ত থাকে। তাই নিজের আগ্রহের বিষয়গুলোতে মনোযোগী হতে পারে, তখন সে শেখে সুন্দরভাবে।
নিরাপত্তাবোধ তৈরি করা
শিশুকে বোঝাতে হবে সে পরিবারের সদস্যদের আদরের। ভালোবাসা শিশুদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। পরিবারে উপস্থিত প্রত্যেক সদস্যের উচিত শিশুকে আদর করা। যদিও ব্যস্ততা থাকবে, নিজেদের অনেক ধরনের মানসিক চাপ থাকবে। অবশ্যই লক্ষ রাখতে হবে- এসব মানসিক চাপ বা ব্যস্ততা শিশুকে দেখানো যাবে না। শিশু হাসিমুখে কথা বলতে এলে তাকে যাও এখান থেকে বা পরে আসো, এ জাতীয় শব্দ ব্যবহার না করে শান্ত হয়ে কিছুক্ষণ গল্প করে একটা খেলনা দিয়ে ব্যস্ত রাখুন। এতে সে নিরাপদ বোধ করবে।
শিশুর মধ্যে নিরাপত্তাবোধ ও ভালো আছি এমন অনুভূতি থাকলে সে যেকোনো পরিবেশে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে শেখে। ফলে তার জীবনে সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। সে অন্যের প্রতি যত্নশীল মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। শিশুর কান্নার সঙ্গে সঙ্গে যদি তাকে সাড়া দেওয়া যায়, তবে সে বুঝতে পারে ‘কেউ না কেউ আমাকে দেখার জন্য আছে’। তাই শিশুকে একা রাখা যাবে না। সে কাঁদলে তাকে জড়িয়ে ধরুন এবং তার প্রয়োজনটি বোঝার চেষ্টা করুন। তাকে আশ্বস্ত করুন যে আপনি তার সঙ্গেই আছেন।
আদর দিতে ও নিতে শেখান
আদর ভালোবাসা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের মতোই একটা প্রয়োজন। শিশুকে কোলে তুলে নেওয়া। তাকে সুন্দর নামে ডাকা। তার দিকে তাকিয়ে হাসা, তাকে টুকটাক উপহার দেওয়া ইত্যাদি করে আদর দিতে হবে। আবার কে কোন আত্মীয়, তাদের কী বলে ডাকতে হবে- এসব শিখিয়ে দেওয়া ও ডাকার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এতে ওইসব আত্মীয়-পরিজনও তাকে ভালোবাসবে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারলে সেও অধিক মানুষের ভালোবাসা পাবে। এ ছাড়া একটু অ্যাকটিভ হলে ও পরিপাটি থাকলে সবাই শিশুকে আদর করে। তাই একটু গুছিয়ে পরিপাটি রেখে তার আশপাশের মানুষের আদর পাওয়াও নিশ্চিত করা সম্ভব।
আত্মবিশ্বাসী হতে শেখান
শিশুদের ছোট ছোট কাজের প্রশংসা করতে হবে। সে যাই চেষ্টা করুক তার জন্য তাকে উৎসাহিত করতে হবে। তার দৈনন্দিন কাজের জন্য আদর ও প্রশংসা করতে হবে। এতে সে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করবে। বাইরে থেকে ফিরলে ডেকে কুশল বিনিময় করতে হবে। এতে শিশু সংসারে নিজের গুরুত্ব সম্পর্কে অবগত হয় এবং নিজেকে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়াস পায়। এ ছাড়া মাঝে মাঝে উপহার দিয়ে তাকে সাহসী করে তুলতে হবে। শিশুর আবেগের সুষ্ঠু বিকাশের জন্য তাকে আত্মবিশ্বাসী হতে হয়। শুধু তা-ই নয়, শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য তার নিজের সম্পর্কে ভালো অনুভূতি থাকা প্রয়োজন। এ অনুভূতি তাকে নতুন কিছু করতে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। ফলে সে নতুন নতুন জিনিস শিখতে পারে ও তার আত্মবিশ্বাস আরও বাড়তে থাকে। শিশুর সঙ্গে তার সম্পর্কে ইতিবাচক কথা বলুন। যেন সে অনুধাবন করতে পারে যে, সে ভালোবাসা পাওয়ার এবং বিভিন্ন কাজ করতে পারার যোগ্যতা রাখে।
আবেগ প্রকাশে বাধা দেবেন না
শিশুদের আবেগ প্রকাশে বাধা দিলে বা আবেগ প্রকাশের কারণে তাকে লজ্জা দিলে তাদের আবেগের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। যেমন- রাগ করে যদি বলা হয় ‘ভয় পেয়ো না’ বা ‘মন খারাপের কী আছে?’ তাহলে সে মনে করতে পারে তার আবেগ ঠিক নয়। সে হয়তো সারা জীবন তার আবেগকে চেপে রাখবে এবং নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় পড়বে। বরং তার আবেগকে স্বীকার করে তাকে আশ্বস্ত করতে হয়। বলা যেতে পারে ‘আমি জানি তোমার মন খারাপ হচ্ছে; কিন্তু দেখবে এটা ঠিক হয়ে যাবে। এ ছাড়া ছেলেরা কাঁদে না, মেয়েদের চিৎকার করতে নেই, কেউ বিরক্ত করলে প্রকাশ করা লজ্জার ইত্যাদি জেন্ডার বায়াসড কথা শিশুদের আবেগ প্রকাশ তথা আবেগ বিকাশের পথে বাধা। এসব কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে।
কলি