‘দখলদার ইসরায়েলিদের বোমা ও স্থল হামলায় অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় এ পর্যন্ত সাড়ে ৪৩ হাজারের বেশি বেসামরিক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আরও হাজার হাজার মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে হারিয়ে গেছেন। এমন মানুষের সংখ্যা ১০ হাজারের কম নয়। আমরা এক বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষুধার শাস্তি ভোগ করছি। মাসের পর মাস ক্ষুধার্ত থাকার অর্থটা কী?’ গাজার খান ইউনিস থেকে রাগ ও ক্ষোভ মিশ্রিত আবেগঘন কথাগুলো সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিবেদক রুয়াইদা আমেরের। তার বয়ানে উঠে এসেছে ক্ষুধার সঙ্গে গাজাবাসীর মর্মস্পর্শী লড়াইয়ের করুণ গল্প।
আমের বলেন, ‘যুদ্ধে বেঁচে থাকাই হয়ে ওঠে একমাত্র লক্ষ্য এবং ক্ষুধা যেন আমাদের জন্য যুদ্ধের এক অনিবার্য পরিণতি। আমাদের ক্ষুধার্ত থাকতে বাধ্য করা হয়েছে। আমরা পছন্দ করে এটি নিয়ে আসিনি। ইসরায়েলি বোমা হামলা থেকে বাঁচতে আমরা ধারাবাহিক সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু আমরা ব্যর্থ হচ্ছি।’
“এটি পরিষ্কার যে ইসরায়েলি বাহিনীর লক্ষ্য হচ্ছে উত্তর থেকে দক্ষিণে গাজার সর্বত্র দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে দেওয়া। শুরু থেকেই ক্ষুধার ভয় আমাদের নিত্যকার বিষয়। আমরা বর্তমানে দিনে একবেলা খেয়ে বেঁচে আছি। ‘আমরা কী খেতে পারি?’ এই প্রশ্নটাকেই আমি ঘৃণা করতে শুরু করেছি। সকালে আমরা যে মাখন খাই, সেই এখই মাখনই জোটে পরের বেলায়। এই ধরনের মাখনের প্রতি আমার ঘৃণা জন্মাতে শুরু করেছে। কিন্তু এটাই আমাদের একমাত্র বিকল্প।’’- বলছিলেন আমের।
পরিবারের দুর্দশার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার মা এবং বোন সকালে ঘুম থেকে উঠে বাজারে যান আমার বোনের ছোট বাচ্চার জন্য কোনো খাবার পাওয়া যায় কি না দেখতে বা আমার ভাইয়ের জন্য খাবার খুঁজতে যে কাজে যায় অথবা আমার মায়ের প্রয়োজনীয় ওষুধগুলো কিনতে। সাধারণত তারা বাজার থেকে হতাশ হয়ে ফিরে আসেন, কারণ সেখানে কিছুই নেই।’
‘আমরা ভাবতাম যে শুধু আমাদের পাড়াতেই মনে হয় খাবার নেই। তাই আমরা অন্য এলাকায় বসবাসরত আত্মীয় ও বন্ধুদের ফোন দিতাম। কিন্তু প্রতিবারই তারা বলত, কিছু টিনজাত খাবার ছাড়া তাদের এলাকার বাজারেও কিছু নেই। আমরা যখন বাইরে যাই, বিক্রেতাদের করুণ চেহারা দেখতে পাই, যাদের দেখে মনে হয় দুনিয়ার সব দুশ্চিন্তা তাদের গ্রাস করেছে। যখন আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলি, তখন কদাচিৎ তারা জবাব দেন, কারণ সেখানে কেনার মতো কিছু নেই। প্রতিদিন তারা একই কথাই বলেন- ক্রসিং এখনো খোলেনি।’ কষ্টের সুরে বলছিলেন আমের।
তিনি আরও বলেন, ‘ইসরায়েলি বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে আমাদের ক্ষুধার কষ্ট দিচ্ছে। আগে করিম আবু সালেম ক্রসিং দিয়ে কিছু সাহায্য আসত। এক মাস ধরে সেটিও বন্ধ করে দিয়েছে তারা। আমাদের মানবিক মর্যাদা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আমি বিশ্বাসই করতে পারি না আমরা কিসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।’
সর্বশেষ প্রাপ্ত খবর অনুসারে, খান ইউনিসের পৌরসভা কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেছে, পানি ও পয়োনিষ্কাশন সেবা চালু রাখার মতো প্রয়োজনীয় জ্বালানির মজুত শেষ হয়ে গেছে। ফলে খুব দ্রুত এলাকাটিতে সুপেয় পানির সংকট দেখা দিতে পারে। এর প্রভাবে বাসিন্দাদের মধ্যে মারাত্মক স্বাস্থ্যসংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে আমেরদের দীর্ঘশ্বাস কী আরও ঘনীভূত হচ্ছে? সূত্র: আল-জাজিরা