চীনের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে বিশ্বের সবচেয়ে উদার বিনিয়োগব্যবস্থার সুবিধা নিয়ে বাংলাদেশের প্রধান খাতগুলোতে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন, ‘এখন বাংলাদেশে বিনিয়োগের সময়। আমি আত্মবিশ্বাসী যে, হাতে হাত মিলিয়ে একসঙ্গে আমরা দুর্দান্ত কিছু অর্জন করতে পারি।’
মঙ্গলবার (৯ জুলাই) বেইজিংয়ে ‘বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য, ব্যবসা এবং বিনিয়োগের সুযোগ’ শীর্ষক বিজনেস সামিটে তিনি এ আহ্বান জানান।’
বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য চীনের ব্যবসায়ী ও কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করতে দেশটির রাজধানীতে এই বিজনেস সামিট আয়োজন করে বাংলাদেশ। সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশের ১০টি কোম্পানির প্রতিনিধির সঙ্গে চীনের বিভিন্ন কোম্পানির ১৬টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে।
অন্যদিকে বুধবার (১০ জুলাই) চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং ও প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংয়ের সঙ্গে শেখ হাসিনার পৃথক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। লি কেকিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর ২০টি সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ।
বিজনেস সামিটে চীনা ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আমাদের অবকাঠামো, জ্বালানি ও লজিস্টিক খাতে বিনিয়োগকে স্বাগত জানাই। আমরা বিশ্বাস করি, চীনা বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে, বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ জ্বালানি খাতে। আমি চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে পোর্টফোলিও বিনিয়োগ অন্বেষণ করার আহ্বান জানাচ্ছি।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার লক্ষ্যে পুঁজিবাজারের আরও উন্নয়নে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। আমরা একটি শক্তিশালী বন্ড বাজার বিকাশে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছি। আমরা ডেরিভেটিভ পণ্য প্রবর্তনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছি, যা আমাদের আর্থিক বাজারকে আরও বৈচিত্র্য ও প্রসারিত করবে।’
বাংলাদেশ ডিজিটাল যুগকে উন্মুক্ত বাহুতে আলিঙ্গন করছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সরকার সক্রিয়ভাবে আইসিটি সেক্টরের প্রবৃদ্ধি জোরদার করছে, স্টার্টআপদের জন্য প্রণোদনা দিচ্ছে, টেক পার্কে বিনিয়োগ করছে এবং উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তাকে উৎসাহিত করে এমন একটি ইকোসিস্টেম গড়ে তুলছে। আমাদের তরুণ উদ্যোক্তারা বিশ্বমঞ্চে তাদের অবস্থান তৈরি করছে এবং আমরা আপনাদের এই আকর্ষণীয় যাত্রার শরিক হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সবুজ প্রযুক্তিতে অসংখ্য সুযোগ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি।’
কোম্পানি পর্যায়ে ১৬ সমঝোতা স্মারক সই
বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে ১৬টি সমঝোতা স্মারকে সই করেছে বাংলাদেশ ও চীনের বেশ কয়েকটি বহুজাতিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে চারটি সমঝোতা স্মারকের অধীনে ৪৯ কোটি ডলারের বিনিয়োগ পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের বস্ত্রশিল্প, বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাণ, সৌরবিদ্যুৎ, ফিনটেক এবং প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ করবে চীনা কোম্পানিগুলো।
বাংলাদেশ ও চীনা কোম্পানিগুলোর মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারকগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো- নগদ ও মোবাইল ফোন সেট নির্মাতা চীনা কোম্পানি হুয়াওয়ে টেকনোলজিস (বাংলাদেশ) লিমিটেডের মধ্যে চুক্তি। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ডিজিটাল আর্থিক প্ল্যাটফর্ম তৈরিতে একটি কৌশলগত অংশীদারত্বমূলক বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে হুয়াওয়ে। এ লক্ষ্যে চীনের ওই বৃহৎ কোম্পানিটির ৫ কোটি ডলার বিনিয়োগের কথা রয়েছে।
ডেক্স বাংলাদেশ টেক লিমিটেড ও হুয়াওয়ে টেকনোলজিসের (বাংলাদেশ) মধ্যে ২ কোটি ডলার বিনিয়োগের সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। বাংলাদেশের মোংলা সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে চীনা কোম্পানি চায়না কেমিক্যাল সিএনসিসির সঙ্গে কাজ করবে বাংলাদেশের দেশবন্ধু ও চেমটেক্স গ্রুপ। মোংলায় প্রায় ৩৩ একর জমিতে বৃহত্তম পিএসএফ, পিইটি বোতল এবং টেক্সটাইল গ্রেডের কারখানা স্থাপনে প্রায় ৪০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে চীনা কোম্পানিটি। এ ছাড়া চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি) ও নিংবো সিক্সিং কোম্পানি লিমিটেড বাংলাদেশের অধীনে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এ ক্ষেত্রে চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ-চালিত গাড়ি উৎপাদনেও বিনিয়োগ করবে চীন। এ ক্ষেত্রে ‘বিলিয়ন ১০ কমিউনিকেশনস লিমিটেড’ ও সিএইচটিসি (হেনইয়াং) ইন্টেলিজেন্ট ইভি (ইলেকট্রনিক ভেহিক্যালস) কোম্পানি লিমিটেড বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাণের বিষয়ে সমঝোতা স্মারকে সই করেছে। সিলেটে একটি সোলার পার্ক স্থাপনের বিষয়ে স্মারকে সই করেছে ‘বিলিয়ন ১০ কমিউনিকেশনস লিমিটেড’ ও নিংবো সান ইস্ট সোলার কোম্পানি লিমিটেড।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতেও বিনিয়োগ করবে চীন। ‘বিলিয়ন ১০ কমিউনিকেশনস লিমিটেড’ ও হোশাইন সিলিকন ইন্ডাস্ট্রি কোম্পানি লিমিটেড নবায়নযোগ্য জ্বালানিশিল্পে বিনিয়োগের জন্য একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছে। ‘বিলিয়ন ১০’ প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বাংলাদেশের বর্জ্য লুব্রিকেন্ট তেল পুনরুদ্ধার এবং পরিশোধনশিল্পে বিনিয়োগের জন্য সমঝোতা স্মারক সই করেছে জুহিয়া নিউ ম্যাটেরিয়াল টেকনোলজি কোম্পানি লিমিটেড।
ঢাকাকে মেগা সিটি হিসেবে গড়ে তুলতে যে প্রকল্প রয়েছে সেখানেও বিনিয়োগ করবে চীন। দেশটির হংজিং ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড ও ইবি সলিউশন লিমিটেড এই প্রজেক্টে বিনিয়োগের জন্য সমঝোতা স্মারকে সই করেছে। এ ছাড়া ইবি সলিউশন লিমিটেডের সঙ্গে চীনের শেরিং নিউ এনার্জি টেকনোলজি লিমিটেড বাংলাদেশে স্মার্ট কোল্ড চেইন লজিস্টিক সলিউশন সেক্টরে বিনিয়োগের জন্য সমঝোতা স্মারক সই করেছে।
কারিগরি ও আর্থিক বিনিয়োগ সহযোগিতার সমঝোতা স্মারকের আওতায় নদী ও সড়কপথে সিএনজি পরিবহনের জন্য বাংলাদেশে ২ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে চীন। এ বিষয়ে ইন্ট্রাকো রিফুয়েলিং স্টেশন পিএলসি ও শিজাঝুং এনরিক গ্যাস ইকুইপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এ ছাড়া কাগজ খাতে বিভিন্ন যন্ত্রপাতির উন্নয়নে বিনিয়োগের কথা রয়েছে। চীনের জিবো জিনহুয়াটেং পেপার মেশিনারি কোম্পানি লিমিটেড ও বাংলাদেশের নিটল নিলয় গ্রুপের মধ্যে এ-সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এ ছাড়া নিটল নিলয় গ্রুপের সঙ্গে যৌথভাবে টিবিআর টায়ার প্রকল্পে বিনিয়োগ করবে চীনা কোম্পানি ঝোংঝো ডংফেং মিড-সাউথ এন্টারপ্রাইজ কোম্পানি।
চীনা কোম্পানি শাংডুং সুনাইট মেশিনারি এবং নিটল নিলয় গ্রুপের সঙ্গে পরিবেশবান্ধব ইট তৈরি খাতে বিনিয়োগ করবে চীন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ও চীন উভয়ই একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে। চীনা কোম্পানি ডালিয়াম হুয়াহান রাবার অ্যান্ড প্লাস্টিক যন্ত্রপাতি খাতে নিটল নিলয় গ্রুপের সঙ্গে বিনিয়োগের চুক্তি করেছে। সর্বশেষ লিথিয়াম ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক যানবাহন খাতে বিনিয়োগ নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এতে বিনিয়োগ করবে চীনা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান জেডপি টেকনোলজি (আনহুই) কোম্পানি লিমিটেড।
চীনের ভাইস মিনিস্টার অব কমার্স লি ফেই, চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান ওয়াং টংঝু, এইচএসবিসি চায়নার প্রেসিডেন্ট ও সিইও মার্ক ওয়াং, হুয়াওয়ের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট সাইমন লিন, বাংলাদেশে চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, চীনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. জসিম উদ্দিন এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান লোকমান হোসেন মিয়া অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবায়াত-উল-ইসলাম।
চীনের সঙ্গে আরও শক্তিশালী অর্থনৈতিক সম্পর্ক চায় এফবিসিসিআই
দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা ত্বরান্বিত করতে চীনের সঙ্গে শক্তিশালী বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক চায় দেশের শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন দ্য ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)। এ জন্য চায়না কাউন্সিল ফর দ্য প্রমোশন অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড (সিসিপিআইটি) ও চায়না চেম্বার অব ইন্টারন্যাশনাল কমার্সের (সিসিওআইসি) সঙ্গে যোগাযোগ আরও জোরদার করতে চায় এফবিসিসিআই।
গতকাল মঙ্গলবার বেইজিংয়ে চীনের ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক সভায় এই আহ্বান জানান এফবিসিসিআই সভাপতি মাহবুবুল আলম। সিসিপিআইটি ও সিসিওআইসির ব্যবসায়ী নেতারা এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
গত সোমবার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি বিশেষ ফ্লাইট প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের নিয়ে স্থানীয় সময় বিকেল ৬টায় বেইজিং ক্যাপিটাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এর আগে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বেলা ১১টা ৫ মিনিটে ছেড়ে যায় উড়োজাহাজটি।