চট্টগ্রামের পাহাড় রক্ষায় এবার অবৈধ দখলদারদের তালিকা করছে জেলা প্রশাসক। পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তালিকাটি করা হচ্ছে। অপরদিকে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা চট্টগ্রামের বইমেলার সমাপনী অনুষ্ঠানে যারা পাহাড় কাটছেন তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার নির্দেশ দিয়ে গেছেন। জনমনে প্রশ্ন এবার চট্টগ্রামের পাহাড় রক্ষা হবে তো?
খবরের কাগজের কাছে বিষয়টি নিশ্চিত করে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ও পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যসচিব সাদি উর রহিম জাদিদ বলেন, ‘পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের পাঠানো চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম শহরের ৬টি ও ১৫ উপজেলার সহকারী কমিশনারদের (ভূমি) চিঠি দিয়ে পাহাড়-টিলার অবৈধ দখলদারদের তালিকা দিতে বলা হয়েছে। তালিকা পাওয়ার পর তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর মন্ত্রণালয় যেভাবে বলবে আমরা সেভাবে কাজ করব।’
এর আগে গত ১১ ফেব্রুয়ারি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় পাহাড়-টিলায় অবৈধভাবে দখলদারদের তালিকা চেয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনকে একটি চিঠি দেয়। চিঠিতে বলা হয়, অনিয়ন্ত্রিতভাবে পাহাড়-টিলা ও গাছপালা কাটা, অবৈধভাবে পাহাড়ে বসতি স্থাপন ইত্যাদি কারণে পাহাড়ের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। পাহাড়ধস, বন্যা, জলাবদ্ধতা পরিবেশ দূষণ জীববৈচিত্র্য হ্রাস, ভূমিক্ষয়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা ঘটছে। চিঠিতে ১৫ দিনের মধ্যে পাহাড়ের অবৈধ দখলদারদের তালিকা তৈরি করে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের যে তথ্য রয়েছে তাতে দেখা যায়, চট্টগ্রাম শহরে সরকারি-বেসরকারি মালিকানাধীন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় আছে ২৬টি। এর মধ্যে ১৬টি সরকারি ও ১০টি ব্যক্তি মালিকানাধীন। এসব পাহাড়ে বসবাস করে ৬ হাজার ৫৫৮টি পরিবার। পাহাড় তদারকিতে ২০০৭ সালের জুন মাসে পাহাড়ধস বিপর্যয়ের পর একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি গত ১৮ বছরে ২৯টি সভা করেছে। প্রথমদিকে সভার কিছু সিদ্ধান্ত গুরুত্বসহকারে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হলেও এখন ওই কমিটিই গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। প্রতিবছর বর্ষা এলে যখন পাহাড়ধসের শঙ্কা তৈরি হয়। তখন তড়িঘড়ি করে সভা ডেকে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে অবৈধ বসবাসকারীদের উচ্ছেদ, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও ওয়াসার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু এসব সিদ্ধান্ত আলোর মুখ দেখে না। অভিযোগ রয়েছে, যেসব সেবা সংস্থা এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করার দায়িত্বে আছে তাদের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এসব অবৈধ কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ কারণে সিদ্ধান্তগুলো আর বাস্তবায়ন হয় না।
এদিকে চট্টগ্রাম শহরে পাহাড় কেটে নির্মাণ করা হচ্ছে আবাসিক এলাকা। বিশেষ করে চট্টগ্রাম শহরসংলগ্ন জঙ্গল সলিমপুরে সরকারি পাহাড় কেটে হাজারো বাড়ি-ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এলাকাটি এখন অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়াও নগরের ষোলশহর বন গবেষণাগারের পাহাড়, ফয়েস লেক, আকবর শাহ, আকবর শাহ লেক সিটি আবাসিক, আকবর শাহ ঝিল, বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন কৃষ্ণছায়া আবাসিক, ওয়্যারলেস কলোনির পাহাড়, জালালাবাদ হাউজিং, গ্রিনভ্যালি হাউজিং, বায়েজিদ শেরশাহ, চন্দ্রনগর, লালখান বাজার, মতিঝর্ণা, পাহাড়তলী, পলিটেকনিক, কুসুমবাগ, কাইচ্যাঘোনা, উত্তর পাহাড়তলীর বিশ্ব কলোনি, বাটালি হিল, প্রবর্তক পাহাড়, জয়পাহাড়, আমবাগান, আরেফিন নগর এলাকাসহ এমন কোনো এলাকা নেই যেখানে পাহাড় কাটা হচ্ছে না।
আকবর শাহ এলাকার বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মী সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘গত বছর ৫ আগস্টের পর পাহাড় কাটা এখন আরও সহজ হয়েছে। আকবর শাহ এবং আশপাশে দিন-রাত পাহাড় কাটা হচ্ছে।’ নগরবিদ প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া বলেন, ‘১৯৬১ থেকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) বলে আসছে বায়েজিদ এলাকায় পাহাড়ে একটি পার্ক করবে। কাগজে-কলমে জায়গা সংরক্ষণ করে রাখা হলেও এখনো কোনো প্রকল্প নেওয়া হয়নি। বরং সেখানে পাহাড় কাটার মহোৎসব চলছে। গড়ে উঠেছে হাজারো বসতবাড়ি।’
চট্টগ্রাম ডেভেলপমেন্ট ফোরামের (সিডিএফ) মুখপাত্র খোরশেদ আলম বলেন, ‘প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখের সামনে পাহাড়গুলো নিশ্চিহ্ন করা হচ্ছে। গত ৩০ বছরে আমরা অন্তত ১২০টি পাহাড় নিশ্চিহ্ন হতে দেখেছি। এই ৮০টি পাহাড় কোনো রকমে টিকে আছে, সেগুলোও চারপাশ থেকে প্রতিনিয়ত কাটা হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে এসব পাহাড় নিশ্চিহ্ন হতে বেশি দিন লাগবে না। পরিবেশ উপদেষ্টা একজন পরিবেশকর্মী। তাই এ কাজে তার আন্তরিকতার অভাব হবে না বলে মনে করি। পরিবেশ উপদেষ্টা চট্টগ্রামে পাহাড় কাটলে শ্রমিককে না ধরে যারা মূল হোতা তাদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছেন। যেহেতু জেলা প্রশাসককে তিনি এই নির্দেশ দিয়েছেন, আশা করছি এবার তা বাস্তবায়ন হবে।’