দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তরনে আট দফা প্রস্তাব দিয়েছে খেলাফত মজলিস।
শনিবার (২৪ মে) দুপুরে রাজধানীর পুরানা পল্টনের খেলাফত মজলিসের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে দলের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের এ প্রস্তাব তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, 'দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশবাসী সবার মধ্যে আশঙ্কা বিরাজ করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদত্যাগ বা অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে অন্যান্যদের মতপার্থক্যের বিষয়ে যেসব খবর প্রকাশিত হচ্ছে তাতে জনগণ খুবই উদ্বিগ্ন ও শঙ্কিত। আমরা মনে করি অপরিসীম ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে জাতির ঘাড়ে জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসা আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটেছে। ২৪ এর জুলাই অভ্যুত্থানের সময় দুই হাজারেরও বেশি মানুষ শহিদ হয়েছেন, হাজার হাজার ছাত্র জনতা আহত হয়েছেন। এখনো অনেকে হাসপাতালের বেডে কাতরাচ্ছেন।'
ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেন, '২০২৪ সালে ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করে। পতিত ফ্যাসিবাদী সরকার দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, প্রশাসন, নির্বাচন ব্যবস্থাসহ সবকিছু বিপর্যস্ত অবস্থায় রেখে যায়। এ অবস্থার উত্তরণ অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। সব রাজনৈতিক দল, সামরিক বাহিনীসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী সব শক্তি অন্তর্বর্তী সরকারকে সহযোগিতা করে আসছে। সরকার সংস্কার, ফ্যাসিবাদীদের বিচার ও নির্বাচনকে সামনে রেখে কাজ করে যাচ্ছিল। রাজনৈতিক দলসমূহও সরকারকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু সম্প্রতি রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে মতবিরোধ, মতভেদ প্রকাশ্য রূপ নেয়। ইতোমধ্যে সরকার ও সেনাবাহিনীর মধ্যে মতপার্থক্যের খবর প্রকাশ পায়, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস পদত্যাগ করতে চাচ্ছেন বলে খবর ছড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দেশবাসী শঙ্কিত হয়ে পড়েছে। অবিলম্বে সব ধরনের শঙ্কা দূর করা জরুরি।'
তিনি আরও বলেন, ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান বা পুনর্বাসন জুলাই শহিদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানির শামিল। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম শেষ করে একটি জাতীয় নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হতে হবে। আমরা শুরু থেকেই বলে আসছি এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করে একটি সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন সম্ভব। সংস্কার, নির্বাচন, ফ্যাসিবাদের বিচার যুগপৎভাবে করতে হবে।'
খেলাফত মজলিসের ৮ দফা প্রস্তাব হলো:
১. বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসের পদত্যাগের সুযোগ নেই। আমরা মনে করি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সংস্কার- নির্বাচনে সার্বিকভাবে সহযোগিতায় সব দল ও প্রতিষ্ঠান প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বর্তমান প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করলে দেশের পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করবে। পতিত ফ্যাসিবাদী ও আধিপত্যবাদী শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে।
২. অবিলম্বে সর্বদলীয় জাতীয় কনভেনশন আহ্বান করা। ফ্যাসিবাদ বিরোধী সব দল ও স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে সৃষ্ট মতানৈক্য দূর করতে হবে। বিভেদ সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ড থেকে সব মহলকে বিরত থাকা।
৩. সংস্কারের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা অর্থাৎ প্রয়োজনীয় মৌলিক সংস্কারের রূপরেখা ও তা চূড়ান্তের মেয়াদ নির্ধারণ করা।
৪. অবিলম্বে জাতীয় নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করা অর্থাৎ জাতীয় নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট দিন-তারিখ ঘোষণা করা।
৫. পতিত ফ্যাসিবাদীদের বিচার দ্রুত সম্পন্নের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগকে গতিশীল করা।
৬. অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হয় এমন পদক্ষেপ ও কার্যক্রমের বিষয়ে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সতর্ক থাকা ৷ সরকারের বিভিন্ন বিভাগ ও প্রশাসনসহ সব অঙ্গকে কার্যপরিধির মধ্যে থেকে পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে সরকারের কাজকে গতিশীল করা।
৭. রাজনৈতিক দলসমূহের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা অব্যাহত রাখা। বিশেষকরে রাখাইনকে মানবিক করিডোর প্রদান, বন্দর ব্যবস্থাপনা বিদেশি সংস্থাকে প্রদানের মত জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রাজনৈতিক দলসমূহের সঙ্গে আলোচনা করা।
৮. নির্ধারিত সংস্কার, পতিত ফ্যাসিবাদীদের বিচার ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সহযোগিতায় নতুন-পুরাতন সব রাজনৈতিক দল, প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া ।
সংবাদ সম্মেলনে দলের আমীর মাওলানা আবদুল বাছিত আজাদ, আহমদ আলী কাসেমী, অধ্যাপক আবদুল জলিল, জাহাঙ্গীর হোসাইন, প্রকৌশলী আবদুল হাফিজ খসরুসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
শফিকুল/মেহেদী/