ঢাকা ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০, বৃহস্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
Khaborer Kagoj

বাঙালির ঐতিহ্য: শীতের পিঠা

প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৮:৫৭ এএম
বাঙালির ঐতিহ্য: শীতের পিঠা
হাসান উল বারী

প্রাচীনকালে পিঠাকে মিষ্টান্নের মধ্যেই ধরা হতো। ‘পিঠা’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘পিষ্টক’ শব্দ থেকে। আবার ‘পিষ্টক’ এসেছে ‘পিষ’ ক্রিয়ামূলে তৈরি হওয়া শব্দ ‘পিষ্ট’ থেকে। পিষ্ট অর্থ চূর্ণিত, মর্দিত, দলিত। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বঙ্গীয় শব্দকোষ বইয়ে লিখেছেন, পিঠা হলো চালের গুঁড়া, ডালবাটা, গুড়, নারিকেল ইত্যাদির মিশ্রণে তৈরি মিষ্টান্নবিশেষ। বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য ধান। ধান থেকে চাল হয় এবং সেই চালের গুঁড়া পিঠা তৈরির মূল উপকরণ। ভারতীয় সভ্যতার প্রেক্ষাপটে বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতিতে পিঠা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার নির্দিষ্ট কোনো বিবরণ নেই, তবে সংস্কৃত সাহিত্যে ‘পিষ্টক’ শব্দটির উল্লেখ মেলে। বাংলা ভাষায় লেখা কৃত্তিবাসী, রামায়ণ, অন্নদামঙ্গল, ধর্মমঙ্গল, মনসামঙ্গল, চৈতন্য চরিতামৃত ইত্যাদি কাব্য এবং মৈমনসিংহ গীতিকার কাজলরেখা গল্পকথনের সূত্র ধরে আনুমানিক ৫০০ বছর আগেও বাঙালির খাদ্য সংস্কৃতিতে পিঠার জনপ্রিয়তার কথা উল্লেখ পাওয়া যায়। সুতরাং বোঝাই যায় যে, বাংলার পিঠা তৈরির ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো। প্রাচীনকাল থেকেই বাংলার ঘরে ঘরে পিঠা তৈরি হয়ে আসছে। সেই সময় বাংলার কৃষিপ্রধান সমাজে ধান ছিল প্রধান খাদ্যশস্য। 

ষড়ঋতুর দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। শীতকাল এগুলোর অন্যতম ঋতু। শীতকালে নতুন ধান ওঠে। সেই ধানে ঘরে ঘরে পিঠা বানানোর উৎসব শুরু হয়। নতুন চালের গুঁড়া আর খেজুর রসের গুড় দিয়ে বানানো হয় নানারকম পিঠা। এগুলোর নানারকম নাম, আবার নানারকম রূপের বাহার। ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা, পুলি পিঠা, দুধপুলি ও পাটিসাপটা বেশ জনপ্রিয়। এ ছাড়া তালের পিঠা, কলা পিঠা, নকশি পিঠা, পাকান পিঠা, কুশলি, তেলে ভাজা পিঠা, পায়েস পিঠা, সেমাই কুলি পিঠা, শামুক পিঠা, গোলাপ পিঠা, লবঙ্গ পিঠা, পাকড়া পিঠা, ডিমের ঝাল পিঠা, মালপোয়া, মালাই পিঠা, বিবিখানা, দুধচিতই, চষি পিঠা, ক্ষীরকুলি, দুধে ভেজানো হাতকুলি ছাড়াও হরেক রকম পিঠা তৈরি হয় বাংলার ঘরে ঘরে। বাংলাদেশে কত শত রকমের পিঠা যে তৈরি হয় তার কোনো তালিকা আজও করা সম্ভব হয়নি। প্রত্যেক বছর বাংলাদেশ শিশু একাডেমি জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে পিঠা মেলার আয়োজন করে থাকে, যেখানে শতাধিক পিঠা প্রদর্শিত হয়। পায়েস, ক্ষীর ইত্যাদি মুখরোচক খাবারগুলোও আমাদের রসনাকে তৃপ্ত করে শীতকালে। এ সময় শহর থেকে অনেকেই গ্রামে যায় পিঠা খেতে। তখন গ্রামের বাড়িগুলো নতুন অতিথিদের আগমনে মুখর হয়ে ওঠে। পিঠা ছাড়া শীতকালে বাঙালির আতিথেয়তাও যেন সম্পূর্ণ হয় না। শীত এলেই বাঙালির পারিবারিক রীতি অনুযায়ী মেয়ে-জামাতাকে দাওয়াত করে আনা হয়। বাড়ির সদস্য ছাড়াও জামাই-ঝি, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশী সবাই মিলে এক আসরে বসে চলত পিঠা খাওয়ার মহোৎসব। যদিও এখন যান্ত্রিক ব্যস্ততার যুগে পরিবারের সবাই মিলে গ্রাম-বাংলার সেই রসাল পিঠা-পায়েস খাওয়ার উৎসবের রীতি অনেকটাই ম্লান হয়েছে। পানির বাষ্পে তৈরি ভাপের মধ্যে দানা গুড় গলে তৈরি হওয়া মিষ্টি মজাদার পিঠার নাম ভাপা পিঠা। এটি বাংলাদেশ তথা ভারতীয় উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী পিঠা। সাধারণত শীত মৌসুমেই ঘরে ঘরে ভাপা পিঠা তৈরির ধুম পড়ে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা ও দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মালদহে ভাপা পিঠা ভাক্কা পিঠা নামে পরিচিত। বিপুল জনপ্রিয়তার কারণে এখন গোটা মালদহ শহরের বিভিন্ন রাস্তায় অসংখ্য দোকান তৈরি হয়েছে ভাক্কা পিঠার। 

বাংলার পিঠার ইতিহাসের সঙ্গে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। যেমন, নবান্ন, পৌষসংক্রান্তি, চৈত্রসংক্রান্তি, বৈশাখী, ঈদ, শারদীয় দুর্গাপূজা, জামাই খাওয়া, বিয়ে, খতনা, জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী ইত্যাদি উৎসবে পিঠা তৈরি ও খাওয়ার বহুল প্রচলন রয়েছে। এই পিঠা তৈরি আর খাওয়া বাংলার মানুষ এমন এক উচ্চপর্যায়ে নিয়ে গেছে, যা যুগে যুগে বাংলার কবি-সাহিত্যিকের কলমে বারবার উঠে এসেছে। পিঠাকে ঘিরে ‘পল্লীস্মৃতি’ কবিতায় বিখ্যাত কবি বেগম সুফিয়া কামাল লিখেছেন, ‘পৌষ পার্বণে পিঠা খেতে বসে খুশীতে বিষম খেয়ে/ আরও উল্লাস বাড়িয়াছে মনে মায়ের বকুনি পেয়ে।’ 
এ ছাড়া পৌষ-পার্বণ কবিতায় ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত লিখেছেন-
‘আলু তিল গুড় ক্ষীর নারিকেল আর।
গড়িতেছে পিঠেপুলি অশেষ প্রকার।
বাড়ি বাড়ি নিমন্ত্রণ, কুটুম্বের মেলা।
হায় হায় দেশাচার, ধন্য তোর খেলা।’

বর্তমানে দেশের প্রায় সব শহরের অলিতে গলিতে, রাস্তার মোড়ে, পাড়া-মহল্লার ফুটপাতে শীতকালে ভাপা ও চিতই পিঠা বানিয়ে বিক্রি করা হয়। এজন্য বিদেশিরা এসব পিঠার নাম দিয়েছেন স্ট্রিট কেক। এক শ্রেণির মৌসুমি পিঠা বিক্রেতা শীতকালে পিঠা তৈরির এ ধরনের ব্যবসা করে থাকেন। এ ছাড়া অনেক বড় বড় হোটেলে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘পিঠা উৎসব’ বা ‘পিঠামেলা’ আয়োজন করা হয়। বড় হোটেলগুলোতে হোম ডেলিভারির সুবিধা থাকায় গ্রাহকরা ঘরে বসেই পাচ্ছেন বাহারি পিঠার স্বাদ। পিঠা বাঙালি সংস্কৃতির একটি অন্যতম উপাদান। 

প্রবাসী বাঙালিদের কেন্দ্র করে বিদেশে পিঠা বাজারজাতকরণের মাধ্যমে আমরা বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারি। ফলে দেশের অর্থনীতির চাকা বেগবান হবে এবং হারিয়ে যাওয়াসহ নতুর নতুন পিঠা উদ্ভাবনে বাঙালি মায়েরা সচেষ্ট হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। 

শীত এলে পিঠাপুলির কদর বেড়ে যায় বহুগুণ। পৌষ-পার্বণ তথা পিঠা-পার্বণের এ আনন্দ ও ঐতিহ্য যুগ যুগ টিকে থাকুক বাংলার ঘরে ঘরে। শিল্পবিপ্লবের যুগে শহরের মায়েরা পিঠা বানানো ভুলে গেলেও গ্রামের মায়েরা কিন্তু এত দ্রুত ভুলে যাননি। আশা করি, তারাই বাঁচিয়ে রাখবেন বাংলার পিঠাকে যুগ থেকে যুগান্তরে। 

লেখক: শিক্ষক, মিলেনিয়াম স্কলাস্টিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, জাহাঙ্গীরাবাদ সেনানিবাস, বগুড়া
[email protected]

রাষ্ট্রভাষার আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর সক্রিয় অংশগ্রহণ ইতিহাসের অনন্য দৃষ্টান্ত

প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:১২ পিএম
রাষ্ট্রভাষার আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর সক্রিয় অংশগ্রহণ ইতিহাসের অনন্য দৃষ্টান্ত
আর কে চৌধুরী

১৯৫২ সালের মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে জীবন দিয়েছিলেন সালাম, রফিক, জব্বার ও বরকতসহ আরও অনেক ভাষা সংগ্রামী। পরবর্তীকালে একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটিও পেয়েছে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের’ অনন্য মর্যাদা। জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুসারে ২০০০ সাল থেকে দিনটিকে বিশ্বের সব দেশেই ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। বাংলাদেশের ভাষাশহিদদের সংগ্রাম ও অবদানের কথা স্মরণ করে বিশ্ববাসী। এর কারণ, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে প্রায় ৬ হাজার ভাষা থাকলেও মাতৃভাষার স্বীকৃতি আদায় ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশের ছাত্রজনতাই কেবল সংগ্রাম করেছেন, প্রাণ দিয়েছেন। আর কোনো দেশে এমন সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের উদাহরণ নেই। সে কারণে একুশের চেতনায় এবং এর অন্তর্গত তাৎপর্যে বিশ্বের সব দেশের মানুষই এখন আন্দোলিত হয়, উজ্জীবিত হয়। তারাও নিজেদের মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও রক্ষার তাগিদ ও দায়িত্ব বোধ করে। এখানেই ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন এবং একুশে ফেব্রুয়ারির বিশেষ তাৎপর্য ও অতুলনীয় সফলতা। 

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী সচেতনভাবে বাঙালির কাছ থেকে ভাষার অধিকার হরণ করতে চেয়েছিল। তারা চেয়েছিল সংখ্যালঘু জনগণের ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিতে। কিন্তু তাদের সেই অপতৎপরতার বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন বাঙালির ত্রাণকর্তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

আজীবন মাতৃভাষাপ্রেমী এই মহান নেতা ১৯৪৭ সালে ভাষা আন্দোলনের সূচনা পর্বে, ১৯৪৮ সালে রাজপথে আন্দোলন ও কারাবরণ, পরে আইনসভার সদস্য হিসেবে রাষ্ট্রভাষার সংগ্রাম ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় অতুলনীয় ভূমিকা রাখেন। এক কথায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার আন্দোলন ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর সক্রিয় অংশগ্রহণ ইতিহাসের অনন্য দৃষ্টান্ত।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তানের একচ্ছত্র অধিপতি হন। এ সময় নবগঠিত দুটি প্রদেশের মধ্যে পূর্ববাংলার প্রতি তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী ভাষাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণ শুরু করে। ফলে শুরু হয় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্মের পরপর কলকাতার সিরাজউদ্দৌলা হোটেলে পূর্ব পাকিস্তানের পরবর্তী কর্তব্য নির্ধারণে সমবেত হয়েছিলেন কিছুসংখ্যক রাজনৈতিক কর্মী। সেখানে পাকিস্তানে একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগঠন করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সে প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তানের কর্মী সম্মেলনে গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠিত হয়। ওই সম্মেলনে ভাষাবিষয়ক কিছু প্রস্তাব গৃহীত হয়।

এ প্রসঙ্গে গাজীউল হক ‘ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘সম্মেলনের কমিটিতে গৃহীত প্রস্তাবগুলো পাঠ করেছিলেন সেদিনের ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান।’ প্রস্তাবগুলো ছিল, ‘বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের লিখার বাহন ও আইন আদালতের ভাষা করা হউক। সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হইবে তৎসম্পর্কে আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার জনসাধারণের উপর ছাড়িয়া দেওয়া হউক এবং জনগণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলিয়া গৃহীত হউক।’

এভাবেই ভাষার দাবি বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে প্রথম উচ্চারিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভারত থেকে তৎকালীন পূর্ববাংলায় প্রত্যাবর্তন করার পর সরাসরি ভাষা আন্দোলনে শরিক হন। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে সমকালীন রাজনীতিবিদসহ ১৪ জন ভাষাবীর সর্বপ্রথম ভাষা আন্দোলনসহ অন্যান্য দাবিসংবলিত ২১ দফা দাবি নিয়ে একটি ইশতেহার প্রণয়ন করেছিলেন। ওই ইশতেহারে ২১ দফা দাবির মধ্যে দ্বিতীয় দাবিটি ছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। ঐতিহাসিক এই ইশতেহারটি একটি ছোট পুস্তিকা আকারে প্রকাশিত হয়েছিল যার নাম ‘রাষ্ট্রভাষা-২১ দফা ইশতেহার-ঐতিহাসিক দলিল।’ ওই পুস্তিকাটি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃত। এই ইশতেহার প্রণয়নে শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান ছিল অনস্বীকার্য এবং তিনি ছিলেন অন্যতম স্বাক্ষরদাতা।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কারাগারে বন্দি ছিলেন। ‘বঙ্গবন্ধু ১৯৫০ সালে গ্রেফতার হন। বন্দি থাকা অবস্থায়ও ছাত্রদের সঙ্গে সবসময় তার যোগাযোগ ছিল। জেলে থেকেই তিনি তার অনুসারী ছাত্রনেতাদের গোপনে দিকনির্দেশনা দিতেন। তিনি ‘জেল থেকেই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে নির্দেশনা দিতেন।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় আমি পুরান ঢাকার কে এল জুবলি স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। তখন আমাদের ক্লাস শিক্ষক ছিলেন কামরুজ্জামান স্যার। তিনি পরবর্তীতে যুক্তফ্রন্ট থেকে মনোনয়ন নিয়ে এমপি হয়েছিলেন। হয়েছিলেন কে এল জুবলি স্কুলের প্রিন্সিপাল। পরবর্তীতে কে এল জুবলি স্কুল কলেজে রূপন্তরিত হলে তিনি কলেজেরও প্রিন্সিপাল হন। তিনি সারা দেশের শিক্ষক সমিতির সভাপতি ছিলেন। কামরুজ্জামান স্যার ভাষা আন্দোলনের ব্যাপারে আমাদের উদ্ভুদ্ধ করেছিলেন। আমি ক্লাস ক্যাপ্টেন হওয়ায় স্যারের সঙ্গে আমার সখ্যতা ছিল ভালো। স্যারের নেতৃত্বে আমরা একাধিকবার মিছিল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলাম। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতেও আমরা মিছিলসহকারের ভাষা আন্দোলনের জনসভায় যোগ দিয়েছিলাম। আমি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ভাষা সংগ্রামী হিসেবে বলছি, বাংলাদেশের এমন কোনো আন্দোলন নেই যার নেতৃত্ব জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেননি। ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান অনস্বীকার্য।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষাবিদ ও ভাষা সংগ্রামী এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে ২ ও ৩ নম্বর সেক্টরের রাজনৈতিক উপদেষ্টা

সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার চাই

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৯:৩১ এএম
সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার চাই
ওসমান গনি

বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। এ ভাষার মাধ্যমেই আমরা একে অপরের সঙ্গে মনের ভাব প্রকাশ করে থাকি। এ ভাষায় কথা বলতে পেরে আমরা আত্মতৃপ্তি পাই। আমরা বাঙালিরা যেভাবে বাংলা ভাষায় কথা বলে বা লিখে আমরা মনের ভাব প্রকাশ করতে পারি, তা অন্য ভাষায় প্রকাশ করা আমাদের জন্য বেশ কষ্টকর। তাই পৃথিবীতে যত ভাষা রয়েছে সব ভাষার চেয়ে আমাদের মাতৃভাষা বাংলা আমাদের কাছে সবার চেয়ে ঊর্ধ্বে। তাতে কারও কোনো সন্দেহ থাকার কথা না। 

বর্তমানে আমাদের এ বাংলা ভাষা হাঁটি হাঁটি পা পা করে আজ আন্তর্জাতিক ভাষার মর্যাদা লাভ করছে। যেটা আমাদের বাঙালির কাছে সবচেয়ে বড় সম্মানের বিষয়। কিন্তু আমাদের এ ভাষা আমরা কোনো ব্যক্তি বা জাতির করুণায় পাইনি। এ ভাষার জন্য আমাদের অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। এ ভাষা আদায় করার জন্য বাঙালি জাতি তাদের বুকের তাজা রক্ত দিয়েছে। শহিদ হয়েছে এ দেশের লাখ লাখ মানুষ। বহু ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের এ প্রিয় বাংলা ভাষাকে চিনিয়ে আনতে হয়েছে। যাদের বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে আমরা আমাদের বাংলা ভাষাকে পেয়েছি আজ আমরা তাদের কাছে চিরঋণী। কিন্তু যারা সংগ্রাম করে আমাদের বাংলা ভাষা এনে দিয়ে গেল আমরা আজ তাদের জন্য কী করতে পেরেছি? আর এ বাংলা ভাষার প্রচলনই বা কতটুকু ধরে রাখতে পেরেছি। যারা ভাষার জন্য নিজেদের জীবন বাজি রেখে ভাষা আনল তারা কি আজ তাদের যথাযথ মর্যাদা পাচ্ছে। 

আমরা প্রায় সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেখি ভাষা শহিদদের স্মৃতিগুলো অযত্ন আর অবহেলায় পড়ে থাকে। এগুলোর যথাযথ কোনো মূল্যায়ন করা হয়নি। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাস আসলে পরে আমরা আমাদের ভাষার জন্য পাগল হয়ে যাই। বছরের অন্য দিনগুলোয় তার কোনো খবর থাকে না। এমনটা হওয়া আমাদের জন্য মোটেও ঠিক না। যে ভাষার জন্য লাখো লোক শহিদ হয়ে ভাষা আনল, সেই ভাষার প্রতি আমাদের সব সময় সচেতন থাকতে হবে। ভাষার কোনো বিকৃত হয় কি না, সে ব্যাপারে আমাদের সজাগ থাকতে হবে। দেশের সর্বত্র বাংলা ভাষার প্রচলন হয় কি না, সেটাও দেখতে হবে। আমাদের দেশের সর্বত্র যদি বাংলা ভাষার প্রচলন চালু রাখতে পারি তাহলে আমাদের ভাষার জন্য সংগ্রাম সার্থক ও সফল হবে। এখনো আমাদের দেশের অনেক জায়গায় ভিনদেশের ভাষার প্রচলন দেখা যায়। যেটা আমাদের জন্য মোটেও কাম্য না। হ্যাঁ ভিনদেশের ভাষারও প্রয়োজন আছে। দেশের কিছু আন্তর্জাতিক ব্যাপার রয়েছে, যেগুলোয় ভিনদেশি ভাষার দরকার হয়। সেক্ষেত্রে আমরা আমাদের ভাষার স্থান দিতে হবে সবার ঊর্ধ্বে। প্রয়োজনে বাংলা ভাষার নিচে ছোট করে ভিনদেশি ভাষা ব্যবহারের নিয়ম করা যেতে পারে। নিজ দেশের ভাষাকে বিসর্জন দিয়ে অন্য দেশের ভাষাকে ওপরে স্থান দিতে হবে তা মানা যায় না। যদি দেওয়া হয় তাহলে ভাষার জন্য বাঙালির সংগ্রাম ও রক্ত বৃথা যাবে। এটা হবে আমাদের বাঙালির জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। যেটা এ দেশের কোনো শিক্ষিত বা অশিক্ষিত লোকই মেনে নেবে না। বাংলা ভাষা অতি সহজ ও মধুর ভাষা হওয়ার কারণে বিশ্বের অনেক দেশের লোক এখন ধীরে ধীরে বাংলা ভাষা শিখতে শুরু করছে। তাদের এ ভাষা শেখানোর জন্য প্রশংসার দাবিদার আমাদের দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। যারা কর্মের তাগিদে বিভিন্ন দেশে গিয়ে কর্মের স্বার্থে নিজ দেশের ভাষা বিদেশিদের শেখান। অনেক ভিনদেশি লোক আমাদের দেশে আসেন আমাদের দেশের লোকজনের সঙ্গে। তারা ধীরে ধীরে বাংলা ভাষায় কথা বলেন। আবার অনেক ভিনদেশি লোক পুরোপুরি বাংলা ভাষায় কথা বলতে শিখেছেন। এটা আমাদের বাঙালিদের গৌরব। কারণ আমাদের মাতৃভাষায় ভিনদেশিরা কথা বলে। 

বাংলা ভাষার প্রসার ঘটাতে যদি আমাদের দেশের নিরীহ লোকেরা এতটুকু দায়িত্ব পালন করে থাকেন তাহলে আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষিত লোকেরা কী করেন? তারা ব্যস্ত থাকেন তাদের ছেলেমেয়েদের ইংরেজি শেখাতে। তারা মনে করেন ছেলেমেয়েরা ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হলে তাদের গৌরব। যেটা মোটেও ঠিক না। হ্যাঁ ইংরেজি শিখবে, তবে আগে নিজ মাতৃভাষা বাংলা শেখার পর। তাহলেই তাদের গৌরব করা সাজে। নিজের মাতৃভাষা পদদলিত করে অন্য দেশের ভাষা ছেলেমেয়েদের শিখানো সেটা বোকামি ছাড়া আর কিছুই না। ইংরেজি যেমন বর্তমানে সারা বিশ্বের ভাষা, পর্যায়ক্রমে বাংলাও হবে একদিন সারা বিশ্বের ভাষা। হয়তো সেদিন আর বেশি দূরে নয়। বর্তমানে আমাদের দেশে লাখ লাখ নতুন লেখক সৃষ্টি হয়েছে। যারা সারা বছর বিভিন্ন গল্প ও উপন্যাসের বই লিখেন একুশের বইমেলায় প্রকাশের জন্য। আর এ বইগুলো এত প্রাঞ্জল ভাষায় লিখেন যেগুলো মানুষ শুধু পড়তেই চায়। এতে মানুষের বই পড়ারও একটা অভ্যাস হচ্ছে। তবে বই লেখার ক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টি রাখতে হবে যাতে ভাষার বানান ও রূপ সঠিক থাকে। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য যেমন আমরা জীবন দিয়েছি এ ভাষার প্রসার ঘটাতে ও আমরা জোর চেষ্টা চালিয়ে যাব। 

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সুনির্দিষ্ট দাবি দুটির একটি ছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, অপরটি সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন চাই। পেছনে ফিরে তাকালে প্রশ্ন উঠতে পারে যে, দুটি দাবি কেন তোলা হলো, একটিই তো যথেষ্ট হওয়ার কথা। রাষ্ট্রভাষা যদি বাংলা হয় তাহলেও সর্বস্তরে তার যে প্রচলন ঘটবে কি না, সে বিষয়ে কোনো সংশয় ছিল কি? জবাব হচ্ছে, হ্যাঁ, ছিল। প্রথমত পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা যে বাংলা হবে এমন দাবি পূর্ববঙ্গের মানুষ তোলেনি, তারা চেয়েছে বাংলা হবে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা অর্থাৎ দুটির একটি। তাই বাংলাকে যদি রাষ্ট্রের ভাষা হিসেবে মেনে নেওয়াও হয় তাহলেই যে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত হয়ে যাবে এমন ভরসা কোথায়? ভরসা নেই বলেই বোধহয় রাষ্ট্রভাষা দাবি সঙ্গে বাংলা প্রচলনের দাবিটাও উঠেছিল।

অখণ্ড পাকিস্তানে বাংলাকে শেষ পর্যন্ত অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নতুন জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ বাঙালি ওই মেনে নেওয়াতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি, যে জন্য ধাপে ধাপে এগিয়ে এবং পূর্ণ স্বাধীনতা প্রাপ্তির প্রয়োজনে তারা এমন একটি রাষ্ট্রই প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে যার অন্যতম নয়, একমাত্র রাষ্ট্রভাষাই বাংলা। বাংলা উচ্চশিক্ষার মাধ্যম হয়নি। তদুপরি শিক্ষা তিন ধারায় বিভক্ত হয়ে গেছে। তিনটির মধ্যে যে ধারাটি ক্রমাগত শক্তি সঞ্চয় করছে এবং যার ভেতরে থেকে বিত্তবান পরিবারের সন্তানরা লেখাপড়া করছে এবং আগামী দিনে যে ধারায় শিক্ষিতরাই সমাজে কর্তৃত্ব করবে বলে ধরে নেওয়া যায়, সেই ধারাটির মাধ্যম অবশ্যই বাংলা নয়। সেটি ইংরেজি। আর বাংলা মাধ্যমে যারা লেখাপড়া করে তাদের ভেতরও ইংরেজির প্রতি আগ্রহ যে কমছে না বরং বাড়ছে এতেও নিশ্চয়ই সন্দেহ নেই। উচ্চস্তরে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা না দেওয়ার ব্যর্থতার দরুন শিক্ষা গভীর হচ্ছে না, এমনকি তাকে যথার্থ শিক্ষাও বলা যাচ্ছে না, কেননা মাতৃভাষা ছাড়া কোনো শিক্ষাই যথার্থ হয় না। উচ্চ আদালতে বাংলাভাষার কার্যকর ব্যবহার নেই, অথচ সেখানে বাদী-বিবাদী আইনজীবী বিচারক সবাই বাঙালি। এটিও বাংলার অপ্রচলনের একটি করুণ দৃষ্টান্ত বৈকি। কিন্তু এসবের কারণ কী?

কারণটা স্পষ্ট, সেটা হলো দেশের শাসক শ্রেণি বাংলা ব্যবহারে আগ্রহী নয়। আমাদের দুর্ভাগ্য যে এদেশের শাসক শ্রেণি বাংলা ভাষার ব্যাপারে কখনোই উৎসাহী ছিল না। অতীতে আমরা পরাধীন ছিলাম, বিদেশিরা আমাদের শাসন করেছে, তারা বাংলা ভাষা ব্যবহার করবে না, বরং তাদের নিজেদের ভাষা চাপিয়ে দিতে চাইবে এটাই ছিল স্বাভাবিক। এ জন্য আমরা দেখেছি সংস্কৃত, ফার্সি এবং পরে ইংরেজি হয়েছে সরকারি ভাষা, বাংলা ভাষা সে মর্যাদা পায়নি। পাকিস্তানিরা চেয়েছিল উর্দুকে চাপিয়ে দেবে। শেষ পর্যন্ত পারেনি। কিন্তু তখন তো দেশ শাসন করছে স্বদেশিরা, তাহলে এখনো কেন বাংলা সর্বত্র প্রচলিত হচ্ছে না? না হওয়ার ঘটনা এই মর্মান্তিক সত্যের প্রতিই ইঙ্গিত করে যে, আমাদের শাসক শ্রেণি এ দেশেরই যদিও তবু তারা ঠিক দেশি নয়। তারা জনগণের সঙ্গে নেই। নিজেদের তারা জাতীয়তাবাদী বলে দাবি করে, কিন্তু তাদের ভেতর দেশপ্রেমের নিদারুণ অভাব। এককথায় এ দেশে তাদের অবস্থানও আগের বিদেশিদের মতোই; তারা কেবল যে জনবিচ্ছিন্ন তা নয়, জনবিচ্ছিন্নতার দরুন তাদের ভেতর গোপন অহংকার রয়েছে। অন্যদিকে তাদের সংযোগ যে পুঁজিবাদী বিশ্বের সঙ্গে তার ভাষা স্পষ্টরূপে ইংরেজি। বাংলা জনগণের ভাষা, চিরকালই তাই ছিল, এখনো সে রকমই আছে; কিন্তু শাসকরা জনগণের থেকে দূরেই রয়ে গেছে, যেমন তারা আগে ছিল। শাসক শ্রেণির সন্তানরা ইংরেজি শেখে, তারা দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করে, বিদেশে ঘরবাড়ি কেনে এবং তাদের সন্তানরা বিদেশমুখো হয়। তাছাড়া বাংলাদেশের রাজনীতিতেও বিদেশিদের হস্তক্ষেপ ঘটছে। বাংলার প্রচলনের অন্তরায় অন্য কেউ ঘটাচ্ছে না, জ্ঞাতে অজ্ঞাতে দেশের বিদেশমুখো ও বিদেশপ্রভাবিত শাসকরাই ঘটাচ্ছে। শাসক শ্রেণির ভেতর রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, আমলা পেশাজীবী, সবাই আছে। তাদের প্রধান যোগ্যতা তারা ধনী। এরা ইংরেজি ব্যবহার করতে পারলে খুশি হয় এবং যখন বাংলা ব্যবহার করে তখন মনমরা থাকে এবং ভাষাকে বিকৃত করে। রাজনীতিকরাই প্রধান, তারাই সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান, তাদের বক্তব্যই আমরা শুনি; লোকে তাদেরই দৃষ্টান্ত বলে মানে, প্রভাবিত হয়, অনুকরণ করে। জাতীয় সংসদে, সভা-সমিতিতে রাজনীতিকরা যে ভাষা ব্যবহার করে তাতে অনেক সময় কানে আঙুল দিতে ইচ্ছা করে। যারা রাজনীতিক নয় তারাও বাংলা ব্যবহার করে বেশ স্বাধীনভাবে, উচ্চারণ ও ব্যাকরণের তোয়াক্কা করে না, আঞ্চলিকতার সঙ্গে ইংরেজি শব্দ মিলিয়ে জগাখিচুড়ি তৈরি করে। যেসব ভুল ইংরেজির ব্যবহার ঘটালে তারা লজ্জায় ম্রিয়মাণ হতো সেগুলো নির্বিচারে ঘটাতে থাকে। লজ্জা পাবে কি, অনেক সময় তারা গর্ব অনুভব করে, ভাবে বাংলা ভালোভাবে না জানাটাই তাদের আভিজাত্যের প্রমাণ। দেশের পরিস্থিতিতে যে নৈরাজ্য বিরাজমান তার ছবি ভাষার প্রতি এই দুর্ব্যবহারের মধ্যে চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে। ওদিকে জনসাধারণের বড় একটা অংশ অশিক্ষিত, যাদের শিক্ষিত বলে গণ্য করা হয় তাদেরও অনেকেই অক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন মাত্র, যথার্থ অর্থে শিক্ষিত নয়। এদের পক্ষে বাংলা ভাষার যথার্থ ব্যবহার সম্ভব নয়।

বাঙালি তার ভাষা নিয়ে গৌরব করে থাকে। গৌরবের কারণ আছে। একটি কারণ বাংলা ভাষায় উচ্চারণের সঙ্গে লিখিতরূপের নৈকট্য। আমরা যেভাবে উচ্চারণ করি সেভাবেই লিখে থাকি। শাসক শ্রেণি মনে হয় শাসিত শ্রেণিকে অন্যদিক থেকে তো বটেই, বানানের ক্ষেত্রেও হ্রস্ব করে ছাড়বে, কোনো ক্ষেত্রেই রেহাই দেবে না। হায় দরিদ্র শ্রেণির মানুষ, তোমরা পালাবে কোথায়? হরফ বিতাড়নের উদ্যোগটা পাকিস্তানি শাসকরাও নিয়েছিল, সফল হয়নি, কেননা শিক্ষিত বাঙালি সেদিন রুখে দাঁড়িয়েছিল; এখন শিক্ষিত বাঙালিদের বিত্তবান অংশ শাসক শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়ে বিতাড়নের কাজটি নিজেরাই সিদ্ধ করছে। 

দুর্দশাটা এমনকি একুশে ফেব্রুয়ারির উদযাপনের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান। আয়োজনের অভাব নেই, কিন্তু একুশের উদযাপনে মৌলিক পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে, সেটা হলো মধ্য রাতে উদযাপনের সূচনাকরণ। বাঙালির উৎসব শুরু হয় সকালে, ইউরোপীয়দেরটা মধ্য রাতে। ওদের মধ্য রাত আক্রমণ করেছে আমাদের সকালবেলাকে। যা ছিল স্বাভাবিক তাকে কৃত্রিম করে দেওয়ার আয়োজন বৈকি! সাংস্কৃতিকভাবে মধ্য রাত থার্টিফার্স্ট নাইটের ব্যাপার, পহেলা বৈশাখের নয়। থার্টিফার্স্ট নাইট আর পহেলা বৈশাখ এখন আলাদা হয়ে গেছে, ইংরেজি নববর্ষ হুমকি দিচ্ছে বাংলা নববর্ষকে; হুমকির লক্ষণ একুশের উদযাপনেও দেখা দিয়েছে। হুমকি এসেছে আরও একটি। সেটি বিশ্বভালোবাসা দিবস। এটি আমাদের নয়, ইউরোপের। এর সঙ্গে যোগ রয়েছে বাণিজ্যের। দখলদারিত্বের ভেতর দিয়ে বিশ্ববাজার এখন কোণঠাসা করতে চায় দেশীয় উৎপাদনকে, ভালোবাসা দিবস প্রকাশ্যে উদ্দীপনা তৈরির মধ্য দিয়ে গোপনে শত্রুতা করছে শহিদ দিবসের সঙ্গে। যে তরুণদের কাছে প্রত্যাশিত ছিল মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া, তারা প্রদর্শনী ঘটাচ্ছে একেবারে ব্যক্তিগত পর্যায়ে দুজনে দুজনে মিলবার অভিপ্রায়ের। আবার ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলের মধ্য দিয়ে বর্তমানে আমাদের দেশের ঘরে ঘরে আগমন ঘটছে হিন্দি ভাষার। এ ভাষার জন্য দেশের প্রতিটি ঘরের দরজা-জানালা খোলা। যার কারণে অনেকেই অতি সহজে বাংলাকে বিতারিত করে হিন্দি ভাষা শিখছে। অতীতে আমরা উর্দুর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলাম, বর্তমানে হিন্দির জন্য আমাদের দরজা-জানালা খোলা। 

সাহিত্যের ব্যাপারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্য অনেক কিছুকেই প্রতিফলিত করে, ভাষা ব্যবহারে উৎকর্ষকে তো অবশ্যই। সাহিত্যের মাধ্যমেই ভাষার সর্বোৎকৃষ্ট বিকাশ ঘটে থাকে। দেশে এখন প্রচুর বই, প্রতি বছর বইমেলাতে বই উপচে পড়ে। কিন্তু অধিকাংশ বইয়েরই অন্তর্গত বস্তু অকিঞ্চিতকর। প্রচুর পরিমাণে বিক্রি হয় উপন্যাস ও উপন্যাসসদৃশ রচনা। জনপ্রিয় এই ধারা পাঠকদের জন্য এক ধরনের আমোদ সরবরাহ করে, অল্প সময়ের জন্য হলেও বাস্তব জগৎকে ভুলিয়ে দেয়। ফলে পাঠকদের একটা রুচি তৈরি হয়, যে রুচি গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ সাহিত্যের স্বাদ গ্রহণের জন্য মোটেই অনুকূল নয়, বরং প্রতিকূল বটে। মাদকাসক্তির মতো অতটা ক্ষতিকর না হলেও কথিত জনপ্রিয় সাহিত্যও এক ধরনের আসক্তি বটে, এ নেশায় যাকে পেয়েছে তার পক্ষে গভীর কোনো বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা সম্ভব না হওয়াটাই স্বাভাবিক। এই সঙ্গে এ ঘটনাও তাৎপর্যহীন নয় যে, মেধাবী লেখকদের কেউ কেউ এখন ইংরেজিতে লিখছেন। তারা ইংরেজিতে উচ্চশিক্ষিত, সেই সঙ্গে ইংরেজি বইয়ের বাজারও তুলনামূলকভাবে উন্নত। এটাও অবধারিত যে, জনমাধ্যমের গুরুত্ব আরও বাড়বে। অনেক বেড়েছে, থামবে না। জনমাধ্যম কিন্তু ভাষার উন্নতিতে সহায়ক হচ্ছে না। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা তো হয়ই না, ভাষাবিকৃতি ঘটে বিজ্ঞাপনে এবং নাটকে। সরকার নিয়ন্ত্রিত মাধ্যমগুলো সরকারের মহিমা প্রচার করতে ব্যস্ত থাকে, তাতে মানুষের বিরক্তি উৎপাদিত হয় এবং প্রচারের ভাষাও হয় নিম্নমানের। এফএম রেডিও তরুণদের যে ভাষা শেখাচ্ছে তা ভাষাচর্চার জন্য মোটেই স্বাস্থ্যকর নয়।

বিশ্বে এখন বাংলাভাষীর সংখ্যা প্রচুর, ৩০ কোটিরও বেশি হবে; সংখ্যাবিচারে বাংলাভাষী মানুষের স্থান পঞ্চম। কিন্তু বাংলা ভাষার মর্যাদা খুবই কম। কারণ কী? কারণ হচ্ছে আমরা সংখ্যায় অনেক ঠিকই কিন্তু ক্ষমতায় সামান্য। অনেকটা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মতোই; পরিমাণে শিক্ষিতদের সংখ্যা অনেক, কিন্তু গুণগতমান নিম্নগামী।

ক্ষমতাহীনতার একাধিক কারণ রয়েছে। প্রধান ও প্রাথমিক কারণটা হলো জ্ঞানচর্চার অপ্রতুলতা। জ্ঞানচর্চা ঠিকমতো হচ্ছে না। আর তার কারণ হলো চর্চা যেটুকু যা হচ্ছে তা বাংলাভাষার মাধ্যমে ঘটছে না। জ্ঞানই যে শক্তি, এ সত্যে কোনো ভেজাল নেই; জ্ঞানের চর্চায় আমরা উঁচুতে উঠতে পারছি না; মেধা ও মনন অবিকশিত রয়ে যাচ্ছে। ফলে ক্ষমতা বাড়ছে না। আমরা তরল হচ্ছি, ঘন হতে ব্যর্থ হয়ে। বিশ্বে তাই বাঙালির কোনো সম্মান নেই। ওদিকে সব বাঙালি বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে আছে, কেননা বাংলাদেশই হচ্ছে বাংলাভাষা চর্চার কেন্দ্রভূমি এবং ভরসাস্থল। আবারও ওই শাসক শ্রেণির জনশত্রুতার বিষয়টির কাছেই যেতে হয়। রাষ্ট্র অনেক কিছুই করতে পারেনি; রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা বাংলা ভাষার চর্চার ক্ষেত্রেই ঘটেছে। ওই ব্যর্থতা অনেক ব্যর্থতার প্রতিপালক। ব্যর্থতার কারণ হলো রাষ্ট্র ভেঙেছে ঠিকই, কিন্তু বদলায়নি। ভেতরে সে আগের মতোই রয়ে গেছে। বদলাবার কথা ছিল, কেননা এই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের ফলশ্রুতিতে। মুক্তির ওই সংগ্রামেরই অংশ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, তারই পরিণতিতে মুক্তিযুদ্ধ এবং তার ভেতর দিয়েই বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা। মুক্তির জন্য প্রয়োজন ছিল বাংলাভাষা চর্চার স্বাধীনতা। সেটা সম্ভব হতো রাষ্ট্রের চরিত্রে অর্থাৎ রাষ্ট্রের ভেতরে শাসক ও শাসিতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যদি মৌলিক পরিবর্তন ঘটত তবেই। সেটা ঘটেনি। শাসক বদল হয়েছে, শাসক-শাসিতের সম্পর্কে বদল হয়নি। মুক্তির সংগ্রামে চালিকাশক্তি ছিল সাধারণ মানুষ। সেই সাধারণ মানুষের মুক্তি আসেনি। তাই তাদের মাতৃভাষাও মুক্তি পায়নি; আগের মতোই শাসকদের অবহেলা ও উৎপীড়নের শিকার হচ্ছে।

কিন্তু হতাশ হওয়ার কারণ নেই। জনগণ আছে এবং তাদের ভাষাও থাকবে। কেবল বাংলাদেশে নয় বিশ্বজুড়ে যে বাঙালিরা রয়েছে তাদের ভাষা অবশ্যই নিজের জন্য মর্যাদার স্থান খুঁজে নেবে। কিন্তু দায়িত্বটা বাংলাদেশের মানুষেরই, নেতৃত্ব তাদেরই দিতে হবে। বাংলাভাষার উৎকর্ষ ও প্রয়োগ বৃদ্ধির জন্য আমরা বিভিন্ন কাজের সুপারিশ করতে পারি। যেমন পাঠাগার গড়ে তোলা; সংস্কৃতিচর্চার গুণ ও ব্যাপকতা বৃদ্ধি। বলতে পারি ব্যক্তিগত উদ্যোগ গ্রহণের আবশ্যকতার কথা। সাহিত্যচর্চার অপরিহার্যতার বিষয় তুলে ধরতে পারি। উচ্চ আদালতের সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের অনুরোধ জানাতে পারি বাংলা ব্যবহারের। কিন্তু মূল ব্যাধিটাকে যেন না ভুলি। সেটা হলো বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চরিত্র। ওই চরিত্রে বদল ঘটিয়ে, রাষ্ট্রকে জনগণের অধীনে নিয়ে আসতে হবে। সেটা ঘটলে রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তিজীবনের সর্বত্র জনগণের ভাষা অব্যাহতরূপে ব্যবহৃত হবে, তার উন্নতির পথে অন্তরায় থাকবে না।

এর জন্য যে সামাজিক বিপ্লব দরকার তার পথে অন্তরায় হচ্ছে পুঁজিবাদ। পুঁজিবাদ মানুষ ও প্রকৃতির মূল শত্রু; পুঁজিবাদ বাংলা ভাষা, বাঙালিদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র এবং বাঙালির দুর্দশার জন্য দায়ী। ভরসা এখানে যে পুঁজিবাদবিরোধী সংগ্রাম বিশ্বজুড়েই শক্তিশালী হচ্ছে, সেই সংগ্রাম বাংলাদেশেও চলছে। সারা বিশ্বে মানুষের মুক্তি যেমন বৃদ্ধ পৃঁজিবাদের যুবকসুলভ দুরন্তপনায় মোকাবিলা না করলে ঘটবে না, আমাদের মুক্তিও তেমনি আসবে না পুঁজিবাদের দুঃশাসনের অবসান ঘটাতে ব্যর্থ হলে। এটা যেন কখনোই না ভুলি যে, ভাষার শত্রু ও মানুষের শত্রু অভিন্ন এবং ওই শত্রুটির নাম পুঁজিবাদ। সমস্যাটা রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক পথে এর সমাধান নেই। বাংলাভাষার প্রয়োজনে আমরা রাষ্ট্র ভেঙেছি, ওই একই প্রয়োজনে শাসক-শাসিতের সম্পর্কের ভেতর পরিবর্তন আনা অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে। বাংলা ভাষার মর্যাদা আমাদেরই রক্ষা করতে হবে। দেশের সর্বত্রই বাংলা ভাষার প্রচলনের ব্যাপারে সরকারের পাশাপাশি সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের সন্তানদের বাংলা ভাষা শেখার ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
Email : [email protected]

বন্ধ হোক যত্রতত্র আবর্জনা ফেলা

প্রকাশ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৯:৫৯ এএম
বন্ধ হোক যত্রতত্র আবর্জনা ফেলা
আর কে চৌধুরী

ঐতিহ্যগতভাবে আবর্জনার শহর হিসেবে যে দুর্নাম গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের রাজধানীর, এত প্রচেষ্টার পরও তা থেকে রেহাই মিলছে না। ঢাকা মহানগরীর ময়লা-আবর্জনা ফেলার জন্য বিভিন্ন স্থানে রয়েছে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস)। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা বর্জ্য সংগ্রহের পর জমা করে এসব এসটিএসে। তারপর সেগুলো নিয়ে যাওয়া হয় সিটি করপোরেশনের বর্জ্য রাখার ভাগাড়ে। তবে প্রায় প্রতিটি এসটিএসের পাশে রাস্তায় পড়ে থাকে ময়লার স্তূপ। টোকাইরা প্লাস্টিক বোতলসহ অন্যান্য পণ্য নিতে ময়লা-আবর্জনা ঘাঁটাঘাঁটি করে যেখানে সেখানে ছিটিয়ে রাখে। রাজধানীতে দুই শতাধিক স্থানে এসটিএস না থাকায় আবর্জনা উন্মুক্ত ফেলে রাখা হয়।

পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, ঢাকা উত্তরে ৫৪টি ওয়ার্ড থাকলেও এখন পর্যন্ত ২৭টিতে এসটিএস তৈরি করতে পারেনি সংস্থাটি। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি এখন পর্যন্ত ৬১টি ওয়ার্ডে এসটিএস নির্মাণ করেছে। দুই সিটি এলাকায় প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ছয় হাজার টনের বেশি ময়লা তৈরি হচ্ছে। যার ৩০ ভাগ বর্জ্য এখনো উন্মুক্ত স্থানে রাখা হয়। এ ছাড়া প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেটসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের মোড়ক পথচারীরা রাস্তায় ফেলছেন। একই সঙ্গে বাসাবাড়ির বর্জ্য এখনো বিভিন্ন সড়কের পাশে ফেলা হচ্ছে বেপরোয়াভাবে। সব মিলিয়ে ২০ ভাগ বর্জ্য এখনো সংগ্রহের বাইরে থেকে যাচ্ছে। যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনার নোংরা পরিস্থিতি বদলাতে ২০১৭ সালে ১৫ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ২০১৯ সালের নভেম্বরে সেটি স্থানীয় সরকার বিভাগে পাঠানো হয়। প্রায় ২৭ মাস ওই খসড়া আটকে থাকার পর ২০২২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি এর অনুমোদন দেয় স্থানীয় সরকার বিভাগ। তবে সে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কোনো গতি নেই বললেই চলে। রাজধানীকে ময়লা-আবর্জনার নগরী হিসেবে দেখতে না চাইলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় গতি আনতে হবে। যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে অর্থদণ্ডের বিধান রাখাও জরুরি। তবেই সুফলের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

দেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বেহালের বিষয়টি বহুল আলোচিত হলেও এক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছে না। হাসপাতালের কর্মীদের একাংশ মেডিকেল বর্জ্য নষ্ট বা ধ্বংস না করে সংক্রমিত অবস্থাতেই ভাঙারি দোকান ও রিসাইক্লিং কারখানায় বিক্রি করে দেয়। জানা যায়, হাসপাতালগুলোয় এ বর্জ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরিবহনে পর্যাপ্ত কর্মী নেই। এ ছাড়া হাসপাতালে নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মীদের অপর্যাপ্ত জ্ঞান চিকিৎসা বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার একটি বড় অন্তরায়। এর নেপথ্যেও রয়েছে দুর্নীতি। টিআইবির হিসাব অনুযায়ী, ৫০ শতাংশেরও বেশি বর্জ্যকর্মী নিয়োগ পেয়েছেন দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে। সরকারি হাসপাতালে বর্জ্যকর্মীর কাজ পেতে ঘুষ দিতে হয়েছে। উদ্বেগজনক তথ্য হলো, ৪০ শতাংশের বেশি বর্জ্যকর্মীর প্রশিক্ষণ নেই; ৬০ শতাংশের বেশি বর্জ্যকর্মী নিজের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত গুরুত্বপূর্ণ বহু তথ্য জানেন না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ অরাজক পরিস্থিতির অবসানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে চিকিৎসা বর্জ্য (ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ) বিধিমালা সংশোধন করা দরকার।

বস্তুত যেকোনো বর্জ্যের আধুনিক ব্যবস্থাপনার কাজটি জটিল ও ব্যয়বহুল। চিকিৎসা বর্জ্য পরিবেশ বিপর্যয়েরও বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর মেডিকেল বর্জ্য যত্রতত্র রাখা হলেও এটি যেন দেখার কেউ নেই। অনেক রোগ ছড়াতে পারে চিকিৎসা বর্জ্যের অনিরাপদ নিষ্কাশনের কারণে। ব্যবহৃত সিরিঞ্জ দিয়ে ইঞ্জেকশন নেওয়ার কারণে অনেকে দুরারোগ্য রোগে ভুগছেন। এ ছাড়া এসব বর্জ্য সংগ্রহকারীরও অনেকে নানা জটিল রোগে ভোগেন। মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষ দায়িত্বশীলতার পরিচয় না দিলে এ খাতে সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা কঠিন হতে পারে। দেশে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অনেক বাধা রয়েছে। এ খাতে উন্নত দেশের মতো অর্থ বরাদ্দ দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তবে যেটুকু বরাদ্দ দেওয়া হয়, সেই অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। দেশে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে কয়েক হাজার অবৈধ বেসরকারি ক্লিনিক-হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এসব প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসার নামে মানুষ প্রতিনিয়ত প্রতারণার শিকার হচ্ছে। এসব অবৈধ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আলোচিত খাতে উল্লেখযোগ্য প্রাপ্তি ঘটবে কি না, এ বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষাবিদ, সাবেক চেয়ারম্যান রাজউক, মহান মুক্তিযুদ্ধে ২ ও ৩নং সেক্টরের রাজনৈতিক উপদেষ্টা

একুশে বইমেলা যেন বাংলা সাহিত্যের প্রাণস্পন্দন

প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১:৫৭ এএম
একুশে বইমেলা যেন বাংলা সাহিত্যের প্রাণস্পন্দন
মো. রেজাউল করিম

একুশে বইমেলা এখন নিছক বই বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অমর একুশে বইমেলা আজ বাংলা ভাষাভাষী মানুষের প্রাণের মেলায় রূপ নিয়েছে। যদিও মাসব্যাপী বই বিপণন মেলার প্রধান আকর্ষণ, এ ছাড়া মেলায় প্রতিদিন পৃথক স্থানে নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, ‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে লেখকের সাক্ষাৎকার, প্রতিদিনই বিষয়ভিত্তিক সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। স্থান-সংকুলানে সমস্যা হওয়ায় বইমেলা ২০১৪ সালে বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউস প্রাঙ্গণ থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্থানান্তরিত হয়েছে। গ্রন্থ প্রকাশনী ও লেখকের সংখ্যাও ক্রমবর্ধমান। একুশে বইমেলা সত্যিকারার্থে লেখক-প্রকাশক-পাঠকের এমন এক মিলনমেলায় রূপান্তরিত হয়েছে, যেখানে শুধু ঢাকা শহর নয়, গোটা দেশ থেকেই লেখক, এমনকি বইপ্রেমী সাধারণ মানুষও আসেন। 

আগে বড় প্রকাশকরা মুদ্রিত পত্রিকায় সীমিত-সংখ্যক বইয়ের বিজ্ঞাপন প্রকাশ করতেন। বর্তমানে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। শুধু প্রকাশক নন, লেখকও অন্তর্জালের বিভিন্ন মাধ্যমে তার নিজ গ্রন্থের প্রচার চালাতে পারছেন। ফলে গ্রন্থপ্রেমী মানুষ সহজেই নানা ধরনের বই, এর বিষয়সূচি ইত্যাদি দেখতে পারছেন এবং বই কেনার ব্যাপারে সহজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন। বইপ্রেমী মানুষ সারা বছরই ফেসবুকে বিভিন্ন লেখকের চিন্তার বহিঃপ্রকাশ স্ট্যাটাস আকারে দেখে লেখকের লেখার মান সম্পর্কে একটা ধারণা করে নেন, যা তার বই কেনার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।

তিন দশক আগেও বইমেলাতে পাঠকরা লেখকদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখেই চলতেন। এখন যেহেতু ফেসবুকের মাধ্যমে লেখক-পাঠক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে, সেহেতু বইমেলাতে তারা পারস্পরিক আলোচনা ও মতবিনিময় করতে পারেন; এর মধ্য দিয়ে লেখকরা পাঠকের মন ও মনন সম্পর্কে অবহিত হতে পারেন। যদিও লেখকের জন্য পাঠকরুচি জেনে লেখালেখি জরুরি তো নয়ই, প্রয়োজনীয়ও নয়। তবে মেলাতে লেখক ও প্রকাশকদের মধ্যে যে যোগাযোগ হয় তা গুরুত্ব বহন করে। অনেক প্রকাশক লেখকের বর্তমান লেখালেখি সম্পর্কে জানতে পারেন, যা তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রণয়নে সহজ হয়।

অনেকেই অধিক-সংখ্যক বই প্রকাশের ব্যাপারে অভিযোগ বা আপত্তি তোলেন। ২০২২-এর বইমেলায় নতুন বই আসে ৩ হাজার ৭৩৭, যার মধ্যে উপন্যাস ও ছোটগল্পের বইয়ের সংখ্যা যথাক্রমে ৫০১ ও ৪৬৭। যদি অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করা হয় তাহলে দেখা যায় যে, আমেরিকা, চায়না, যুক্তরাজ্য ও জাপানে ২০২১ সালে এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২৭৫২৩২, ২০৮৪১৮, ১৮৬০০০ ও ১৩৯০৭৮ (সোর্স: wordsrated.com/number-of-books-published-per-year-2021)। তাহলে ১৭ কোটি মানুষের দেশে ৩ হাজার ৭৩৭টি বই প্রকাশ কি বেশি বলে প্রতীয়মান হয়? যারা মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তাদের উদ্দেশে বলতেই হয়, মানসম্পন্ন বই-ই প্রকাশিত হতে হবে- এটি কি পূর্ব থেকে নির্ধারণ করা সম্ভব? 

তারপরও বলতে হয়, ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় তদানীন্তন পূর্ববাংলায় না ছিল উল্লেখযোগ্য লেখক, না ছিল বইয়ের বাজার। এ দেশে মূলত মানসম্পন্ন লেখালেখির গোড়াপত্তন হয় ষাটের দশকে। তথাপি সত্তরের দশকও এ দেশের বইয়ের বাজার মূলত পশ্চিমবঙ্গের বইয়ের দখলেই ছিল। আশির দশকে বাংলাদেশের মানুষ ব্যাপকভাবে এ দেশের লেখকের বইয়ের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। নব্বইয়ের দশকে তা এতটাই বিস্তার লাভ করে যে, এখন ফেসবুকে সাধারণ লেখালেখি করতে করতে অনেকে বই লেখায় আগ্রহী হয়ে উঠছেন। এই প্রক্রিয়াকে আমি সাধুবাদ জানাই। শতকুঁড়ির মধ্যে সবগুলো না, তবে কিছু কুঁড়ি ফুল হিসেবে বিকশিত হবে- এটিই আমাদের বিবেচনা করতে হবে। 

বিগত ৫৩ বছরে আমাদের দেশে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থার নিয়ে যেসব রাজনৈতিক ইতিহাসের বই লেখা হয়েছে, তা পরবর্তীতে একাডেমিশিয়ান তথা ঐতিহাসিকদের জন্য ইতিহাস রচনায় প্রধানতম  উপকরণ বলে বিবেচিত হবে। অন্যান্য মননশীল গ্রন্থ রচনাও যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক। 

এখন আমাদের দেশে রচিত উপন্যাস অন্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হচ্ছে। আমাদের দেশের অন্তত ১০ জন লেখকের বই ইংরেজি শুধু না অন্য ভাষায়ও অনুদিত হচ্ছে। এই সফলতার পেছনে শুধু বইমেলা যে অবদান রাখে তা নয়, তবে বইমেলা আমাদের সার্বিক লেখালেখির যে বিশাল যজ্ঞ তার বহিঃপ্রকাশ। 

লেখক : কথাসাহিত্যক ও সমাজ গবেষক    
[email protected]

বইমেলা বাঙালির প্রাণের মেলা

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০১:৪১ পিএম
বইমেলা বাঙালির প্রাণের মেলা
ওসমান গনি

বাঙালির প্রাণের মেলা অমর একুশে গ্রন্থমেলা, যাকে সাধারণ মানুষ জানে ও চেনে বইমেলা হিসেবে। আমাদের আবেগি মনের অনুভূতি আদান-প্রদানের মেলা অমর একুশে বইমেলা। আবহমানকাল থেকেই আমাদের দেশে হরেক রকমের মেলার আয়োজন হয়ে আসছে, তার মধ্যে অমর একুশে বইমেলা হলো সর্বোৎকৃষ্ট মেলা, বাংলা একাডেমি আয়োজিত একুশে বইমেলা, যেখানে জ্ঞানের বিনিময় ঘটে বইয়ের মাধ্যমে। বইপড়া ব্যতীত জ্ঞানার্জনের সঠিক পথ নেই। তাই জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে বইয়ের ভূমিকা অপরিসীম। যে মেলা বইপ্রেমী মানুষের প্রাণে দোলা দেয়। কোনো এক অদৃশ্য শক্তিবলে লাখো মানুষকে টেনে আনে একাডেমির বর্ধমান হাউস প্রাঙ্গণে। কবি, লেখক, পাঠক ও প্রকাশকদের এক মিলনমেলা। বইমেলা আমাদের অন্তরে যে বন্ধন তৈরি করে তা ভাঙে না কখনো। দেশের প্রতি, মানুষের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে। অনুপ্রেরণা জোগায়। স্মৃতিবাহী একুশের সঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনা ও তরুণ প্রজন্মকে সঠিক মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বাঙালি জাতীয়তাবোধকে আরও বেশি করে মনে রাখার জন্য আজকের একুশের বইমেলা। 

বইমেলা মানুষের চিন্তার পরিমাপক। এর মাধ্যমে মানুষের রুচি ও আদর্শের উন্নতি ঘটে। তাই বইমেলার উন্নয়নে আমাদের আন্তরিক হতে হবে। বই পড়ে মানুষ জ্ঞান অর্জন করে হয় উদার, মহীয়ান। আর মহীয়ান মানুষই জাতিকে করে উন্নত। তাই শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রসারে বইমেলার অবদানকে স্বাগত জানাই

বই হচ্ছে মানুষের সেই বন্ধু যার জাগতিক কোনো শরীর নেই কিন্তু সে ধারণ করতে পারে সমগ্র মহাবিশ্বকে। যার পরতে পরতে লুকায়িত আছে এক অনন্ত অসীম ঐশ্বর্য। যে সেই অপার ঐশ্বর্যে ডুব দিয়েছে একাগ্র সাধনায়, সে পেয়েছে বইয়ের নিজস্ব সত্তার আসল অকৃত্রিম ভাণ্ডার, সে হয়ে উঠেছে বইয়ের অবিচ্ছেদ্য প্রেমিক। বইমেলা বইয়ের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বাড়ায়। মেলা শুরু হলে বই কেনার প্রতি বিশেষ তাগিদ অনুভব করি আমরা। তা ছাড়া দূর-দূরান্ত থেকে বহু প্রকাশক আসেন বইমেলায়। আসে নানা ধরনের বই। অচেনা-অজানা অনেক বইয়ের সন্ধান মেলে। ইচ্ছে অনুযায়ী সেগুলো কেনার সাধ্য হয় অনেকের। অন্তত মেলার সুবাদে কিছু বইয়ের সঙ্গে ক্ষণিকের জন্য হলেও পরিচয় মেলে।

ব্যক্তি জাগতিক রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে এ প্রজন্মের মানুষের কথা বলার সুযোগ নেই কিন্তু তার চিন্তা, তার দর্শনের সঙ্গে আলাপ করার সুযোগ রয়েছে, ব্যক্তি বিভূতিভূষণ, বার্ট্রান্ড রাসেল, লালন ফকির, হুমায়ুন আজাদ, কাজী নজরুল ইসলাম, এমন সবার সঙ্গে সবার দর্শনের সঙ্গে আমাদের কথা বলার একমাত্র পথ হচ্ছে বই। তাদের রচিত বই তাদের চিন্তা, দর্শন তৎকালীন সময়ের সমাজ, জীবন সব বিষয় সম্পর্কে ধারণা দেয়, যা আমরা কেবল তাদের রচিত বইয়ের মাধ্যমেই পেতে পারি। সে জন্য বইয়ের গুরুত্ব আমার কাছে সর্বোচ্চ ও সর্বাধিক।

বইমেলা যেকোনো জাতির জন্য অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। বইয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক যত নিবিড় ও ঘনিষ্ঠতর হবে, সেই মানুষ তত উন্নত চিত্তের অধিকারী হবে। বিশ্বের যত জ্ঞানী-গুণী, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, বিপ্লবী এবং স্মরণীয়-বরণীয় ব্যক্তির জন্ম হয়েছে, প্রত্যেকের জীবনই বইয়ের সঙ্গে ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। বিশ্বের ইতিহাসে তাকালে দেখা যায়, বিপ্লবী নেতা চে গুয়েভারা সবসময় বন্দুকের সঙ্গে পাবলো নেরুদার ‘কান্তো জেনারেল’ বইটি রাখতেন; বিশ্বখ্যাত আলেকজান্ডার দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় বই পড়ে অতিবাহিত করতেন। বাংলা একাডেমি প্রতি ফেব্রুয়ারি মাসে আয়োজন করে অমর একুশে বইমেলা। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ২১ তারিখ বাংলা ভাষার জন্য আত্মোৎসর্গের যে বীরত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে, সেই স্মৃতিকে অম্লান রাখতেই এ মাসে আয়োজিত বইমেলার নামকরণ করা হয় অমর একুশে বইমেলা।

অমর একুশে বইমেলার পথিকৃৎ হিসেবে যার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, তিনি হলেন মুক্তধারা ও পুঁথিঘর প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী মান্যবর প্রয়াত চিত্তরঞ্জন সাহা। যিনি সর্বপ্রথম আনুমানিক ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বর্ধমান হাউস প্রাঙ্গণের বটতলায় মাটিতে চট বিছিয়ে নিজের প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রকাশিত ৩০-৩২টির মতো বই বিক্রি শুরু করার মধ্য দিয়ে বইমেলার গোড়াপত্তন করেন। এরপর থেকে তিনি একাই ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত বইমেলা চালিয়ে যান। তিনি ১৯৭৫ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বই বিক্রির অনুমতি লাভ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের মাধ্যমে নতুনমাত্রা লাভ করতে সক্ষম হন, ১৯৭৬ সালের দিকে অন্যও অনুপ্রাণিত হয়ে তার সঙ্গে যোগ দিতে শুরু করেন। এরপর ১৯৭৮ সালে সরকার একে পূর্ণাঙ্গ বইমেলা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৭৯ সালে বইমেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় চিত্তরঞ্জন সাহার প্রতিষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ পুস্তক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি’। ১৯৮৪ সালে গ্রন্থমেলার জন্য সরকারিভাবে আইন পাস করে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহিদ হওয়া সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরও অনেক শহিদের স্মরণে নামকরণ করা হয় ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’। সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত মহাসমারোহে চলছে গ্রন্থমেলার পথচলা। শুরু থেকে বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসকে কেন্দ্র করেই বইমেলার বিস্তৃত ছিল, ২০১৪ সাল থেকে অমর একুশে গ্রন্থমেলা সম্প্রসারণ করে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণসহ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমানে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রকাশনা সংস্থা তাদের নিজস্ব বই ও প্রকাশনা নিয়ে অংশগ্রহণ করে থাকে; এর মধ্যে ভারত, রাশিয়া ও জাপানসহ অন্যান্য দেশের অংশগ্রহণ লক্ষ করা যায়।

বইমেলা বইয়ের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বাড়ায়। মেলা শুরু হলে বই কেনার প্রতি বিশেষ তাগিদ অনুভব করি আমরা। তা ছাড়া দূর-দূরান্ত থেকে বহু প্রকাশক আসেন বইমেলায়। আসে নানা ধরনের বই। অচেনা-অজানা অনেক বইয়ের সন্ধান মেলে। ইচ্ছে অনুযায়ী সেগুলো কেনার সাধ্য হয় অনেকের। অন্তত মেলার সুবাদে কিছু বইয়ের সঙ্গে ক্ষণিকের জন্য হলেও পরিচয় মেলে।

বইমেলাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন প্রকাশক একে অন্যের সঙ্গে ভাববিনিময়ের সুযোগ পান। বই প্রকাশ সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনারও অবকাশ পান। এ ছাড়া পাঠকদের চাহিদা সরাসরি লক্ষ করে নতুন নতুন বই প্রকাশের ক্ষেত্রে তারা তাদের কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে পারেন। বইমেলায় নানা ধরনের প্রকাশক স্টল খোলেন। এক এক প্রতিষ্ঠান এক এক ধরনের বই পছন্দ করে। ফলে ক্রেতারা তাদের অভিরুচি অনুযায়ী স্টল নির্বাচন করে বই কিনতে পারে। এ ছাড়া মেলা প্রাঙ্গণের সীমানায় অসংখ্য ধরনের বই পাওয়া যায় বলে ক্রেতাদের পক্ষে অল্প আয়াসে নিজ নিজ চাহিদা অনুযায়ী বই সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। বইমেলার সুরুচিসম্মত ও মনোরম পরিবেশ ক্রেতাদের সৌন্দর্য পিপাসাকে উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে বই কেনার ব্যাপারে উৎসাহ জোগায়। এ ছাড়া বইমেলায় বইয়ের মূল্যের দিক থেকে ক্রেতাদের কিছুটা কমিশন দেওয়া যেতে পারে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
[email protected]