মানবসভ্যতার ইতিহাসে নারী অনেক সময়ই নিগৃহীত, অবহেলিত ও অধিকারবঞ্চিত থেকেছে। কখনো তাকে দেবী করে বন্দনায় রাখা হয়েছে, আবার কখনো পদদলিত করে ক্রীতদাসীরূপে ব্যবহার করা হয়েছে। এই দুই চরমপন্থার মাঝখানে ইসলাম নারীকে দিয়েছে একটি ভারসাম্যপূর্ণ, সম্মানজনক ও মানবিক মর্যাদা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আজও অনেক মুসলিম সমাজে এই চিত্র বিকৃত। ইসলামের প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গিকে আড়াল করে রাখা হয়েছে সংস্কার, ভ্রান্ত অনুশীলন ও পুরুষতান্ত্রিক ব্যাখ্যার আড়ালে। এই প্রবন্ধে আমরা ফিরে তাকাব মূল উৎসে কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে এবং খুঁজে দেখব নারীর মর্যাদার আসল রূপ।
নারী: সৃষ্টির পূর্ণাঙ্গ এক অর্ধাঙ্গিনী
আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের প্রভুকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি (আদম) থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকেই সৃষ্টি করেছেন তার সঙ্গিনীকে। (সুরা নিসা, ১)। এই আয়াত নারীর সৃষ্টিকে একটি গৌণ বা অবনমিত অবস্থান থেকে নয়, বরং মানবজাতির মূল কাঠামোর অংশ হিসেবেই উপস্থাপন করেছে।
নারীর শিক্ষা ও জ্ঞানার্জনের অধিকার
নবি মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর ফরজ। (ইবনে মাজাহ, ২২৪)। এটি একটি বিপ্লবী ঘোষণা। কারণ সপ্তম শতাব্দীর আরব সমাজে নারীর কোনো শিক্ষা ছিল না। ইসলাম নারীর শিক্ষা অর্জনকে ফরজ ঘোষণা করে তাকে স্বতন্ত্র চিন্তাশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার পথ খুলে দেয়।
আর্থ-সামাজিক অধিকার: সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার
ইসলাম নারীর আর্থিক স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিয়েছে এমন সময়েও যখন অধিকাংশ সভ্যতাই নারীর সম্পত্তির অধিকার অস্বীকার করত। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, পুরুষদের জন্য রয়েছে যা তারা অর্জন করে এবং নারীদের জন্য রয়েছে যা তারা অর্জন করে। (সুরা নিসা, ৩২)। নারী উত্তরাধিকার পায়, মোহরানা (মহর) পায়, ব্যবসা করতে পারে, এমনকি তার উপার্জনের ওপর স্বামীর কোনো দাবি নেই- এসবই ইসলামের মৌলিক বিধান।
বিয়ের স্বাধীনতা ও মতামত প্রদানের অধিকার
কোনো নারীকে জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া ইসলামে নিষিদ্ধ। রাসুল (সা.) বলেছেন, যে নারীর বিয়েতে তার মতামত নেওয়া হয়নি, সেই বিয়ে বাতিল। (আবু দাউদ, ২০৯৬)। একজন নারীর সম্মতি ছাড়া বিয়ে সম্পন্ন হতে পারে না এটি ইসলামের নীতি।
নারীর সামাজিক মর্যাদা ও মাতৃত্ব
মা হিসেবে নারীর মর্যাদা আরও একধাপ ওপরে। হাদিসে এসেছে, তোমার সর্বাধিক হকদার কে? রাসুলুল্লাহ (সা.) তিনবার বললেন: তোমার মা। (বুখারি ও মুসলিম)। এটি নারী-মাতৃত্বকে কেবল জীববৈচিত্রিক অবস্থান নয়, বরং আধ্যাত্মিক ও নৈতিক এক উচ্চতায় উন্নীত করে।
চিন্তার খোরাক: নারীমুক্তি না নারীর মর্যাদা?
আজকের তথাকথিত নারীমুক্তি আন্দোলন নারীকে এমন এক প্রতিযোগিতামূলক প্রেক্ষাপটে দাঁড় করায়, যেখানে নারীত্ব একটি বাধা। অথচ ইসলাম নারীকে তার স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছে। নারী পুরুষের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং সহযাত্রী- এটাই ইসলামের মূল দর্শন। ইসলামের দৃষ্টিতে নারী কেবল ‘মর্যাদাপূর্ণ’ নয়, বরং সে এক পূর্ণাঙ্গ মানবিক সত্তা, যাকে সৃষ্টিকর্তা দিয়েছেন অধিকার, স্বাধীনতা ও সম্মান। এই মর্যাদা কোনো সংস্কৃতি বা সময়ের দ্বারা নির্ধারিত নয়, বরং এটি চিরন্তন, ঐশী ও ন্যায়ভিত্তিক।
সমাজে প্রকৃত পরিবর্তন আনতে হলে ইসলামের এই মানবিক ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিকে তুলে ধরতে হবে। কেবল নারীর নামে স্লোগান নয়, দরকার তার মর্যাদার বাস্তবায়ন।
লেখক : শিক্ষক, জামিয়া আরাবিয়া কওমিয়া দারুন নাজাত