ইসলামি শরিয়তে মৃত ব্যক্তিকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা। কোনো মুসলমান মৃত্যুবরণ করলে তার মাগফিরাত বা পরকালীন মুক্তির কামনায় যে বিশেষ নামাজ আদায় করা হয়, তাকেই বলা হয় জানাজার নামাজ। এটি ‘ফরজে কিফায়া’। অর্থাৎ, সমাজের কিছু মানুষ আদায় করলে বাকিরা দায়মুক্ত হন, তবে এর সওয়াব ও গুরুত্ব অপরিসীম।আজকের আলোচনায় জানাজার নামাজের নিয়ত, নিয়ম এবং দোয়াগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।
ইসলামের প্রতিটি ইবাদতের মূলে রয়েছে নিয়ত। হজরত ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। মানুষ তার নিয়ত অনুসারে প্রতিফল পাবে।’ (সহিহ বুখারি, ১)।
নিয়ত বলতে অন্তরের দৃঢ় সংকল্পকে বোঝায়। জানাজার নামাজের জন্য অন্তরে এই ইচ্ছা থাকলেই চলে যে, ‘আমি এই ইমামের পেছনে জানাজার নামাজ আদায় করছি’। কোনো নির্দিষ্ট আরবি বাক্য বা গতানুগতিক বাংলা উচ্চারণের প্রয়োজন নেই। এমনকি মরদেহ পুরুষ না নারী, শিশু না প্রাপ্তবয়স্ক—এটি না জানলেও নামাজ শুদ্ধ হয়। তবে ইমাম বা দায়িত্বশীলদের উচিত নামাজ শুরুর আগে মরদেহের পরিচয় স্পষ্ট করে দেওয়া, যাতে মুসল্লিরা তৃতীয় তাকবিরের পর সঠিক দোয়া পড়তে পারেন।
যদি কেউ অন্তরের সাথে মুখে নিয়ত উচ্চারণ করতে চান, তা বিদআত নয়। সেক্ষেত্রে সহজ বাংলায় বলা যায়: ‘আমি চার তাকবিরসহ এই ইমামের পেছনে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করার উদ্দেশ্যে জানাজার নামাজের নিয়ত করছি, আল্লাহু আকবার।’
জানাজার নামাজের ফরজ ও সুন্নত
জানাজার নামাজ শুদ্ধভাবে আদায় করতে এর ফরজ এবং সুন্নতগুলো জানা দরকার।
ফরজসমূহ:
১. চারটি তাকবির বলা।
২. দাঁড়িয়ে নামাজ পড়া (ব্যতিক্রমী ওজর ছাড়া বসে পড়া জায়েজ নয়)।
সুন্নতসমূহ:
প্রথম তাকবিরের পর সানা পড়া।
দ্বিতীয় তাকবিরের পর দরুদ শরিফ পড়া।
তৃতীয় তাকবিরের পর মৃতের জন্য নির্দিষ্ট দোয়া পড়া।
জানাজার নামাজের ধারাবাহিক নিয়ম ও দোয়া
জানাজার নামাজে রুকু বা সিজদা নেই। ইমামের সাথে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে কান পর্যন্ত হাত উঠিয়ে সাধারণ নামাজের মতো হাত বাঁধতে হয়। এরপর নিম্নোক্ত ধাপ অনুসরণ করুন:
প্রথম তাকবিরের পর (সানা): প্রথম তাকবির বলে হাত বাঁধার পর নিচু স্বরে সানা পড়ুন।
বাংলা উচ্চারণ:সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা, ওয়া তাবারাকাসমুকা, ওয়া তাআলা জাদ্দুকা ওয়া লা ইলাহা গাইরুকা।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি তোমার সপ্রশংস পবিত্রতা বর্ণনা করছি। তোমার নাম বরকতময়, তোমার মর্যাদা সুউচ্চ এবং তোমার ছাড়া কোনো মাবুদ নেই।
দ্বিতীয় তাকবিরের পর (দরুদ শরিফ): ইমাম দ্বিতীয় তাকবির বললে হাত না উঠিয়ে হাত বাঁধা অবস্থায় দরুদ ইব্রাহিম পড়ুন।
বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহিমা ওয়া আলা আলি ইবরাহিম ইন্নাকা হামিদুম-মাজিদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ কামা বারাকতা আলা ইবরাহিম ওয়া আলা আলি ইবরাহিম ইন্নাকা হামিদুম-মাজিদ।
অর্থ: হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ (সা.) ও তার বংশধরের ওপর রহমত বর্ষণ করো, যেমন ইবরাহিম (আ.) ও তার বংশধরের ওপর করেছিলে। নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসিত ও মহিমান্বিত।
তৃতীয় তাকবিরের পর (মৃতের জন্য দোয়া): ইমাম তৃতীয় তাকবির বললে হাত না উঠিয়ে মৃতের জন্য দোয়া পড়ুন।
প্রাপ্তবয়স্কের জন্য: আল্লাহুম্মা-গফিরলি হায়্যিনা ওয়া মাইয়্যিতিনা ওয়া শাহিদিনা ওয়া গায়িবিনা ওয়া সাগীরিনা ওয়া কাবীরিনা ওয়া যাকারিনা ওয়া উনছানা। আল্লাহুম্মা মান আহইয়াহতাহু মিন্না ফাআহয়িহী আলাল ইসলামি ওয়া মান তাওয়াফ ফাইতাহু মিন্না ফাতাওয়াত্তফাহু আলাল ইমান।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমাদের জীবিত-মৃত, উপস্থিত-অনুপস্থিত, ছোট-বড়, পুরুষ-নারী সবাইকে ক্ষমা করো। যাদের জীবিত রেখেছো, তাদের ইসলামের ওপর রাখো; যাদের মৃত্যু দিয়েছো, তাদের ইমানের সাথে মৃত্যু দাও।
চতুর্থ তাকবির ও সমাপ্তি: তৃতীয় দোয়া শেষে ইমাম চতুর্থ তাকবির বললে কোনো দোয়া ছাড়াই ডানে-বামে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করুন।
হাত বাঁধা ও ছাড়ার নিয়ম
জানাজায় শুধু প্রথম তাকবিরে কান পর্যন্ত হাত উঠানো হয়। বাকি তাকবিরগুলোয় হাত ওঠানোর দরকার নেই। হাত ছাড়ার ব্যাপারে দুটি মত আছে: চতুর্থ তাকবিরের পরপরই ছেড়ে দেওয়া বা সালাম ফেরানোর পর ছাড়া। দুটোই শুদ্ধ, তাই যেকোনো একটি অনুসরণ করুন।