পেশাগত জীবনে চ্যালেঞ্জ থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে পেশা যদি হয় সাংবাদিকতা, আর জেন্ডারে তিনি নারী! তা হলে তার চ্যালেঞ্জের মাত্রাটাও যেন একটু বেশিই থাকে। একমাত্র পেশা সাংবাদিকতা; যেখানে একজন নারীকে পেশাগত ঝুঁকি, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং মাস শেষে নিয়মিত বেতন না পাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়। এর সঙ্গে রয়েছে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার আধিপত্য ও ধর্মীয় গোঁড়ামি।
রিপোর্টিং করতে গিয়ে নারীকে রাজপথে হেনস্থা ও হয়রানির শিকার হতে হয়। সাংবাদিকতাকে নারীর পেশা হিসেবে মনে করেন না অনেকেই। তার পরও সংকটপূর্ণ এই পেশাকে ভালোবেসে সব ধরনের প্রতিবন্ধকতাকে জয় করেই কর্মস্থলে সাফল্যের সাক্ষর রাখছেন এই পেশার সংগ্রামী নারীরা।
প্রায় দুই দশক আগেও সাংবাদিকতায় নারীর হার ছিল ৭ শতাংশ। এ দেশে নারী সাংবাদিকদের সঠিক কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও আশার কথা হলো, নারী সাংবাদিকরা সেই অবস্থান থেকে এখন অনেকদূর এগিয়েছে। গত ১০ বছরে সাংবাদিকতার বিভিন্ন সেক্টরে বেড়েছে নারীর অংশগ্রহণ। গ্লোবাল মিডিয়া মনিটরিং প্রজেক্টের এক হিসাব অনুযায়ী, এ দেশের সংবাদপত্রে ৮ শতাংশ, রেডিওতে ৩৩ শতাংশ এবং টেলিভিশনে ১৯ শতাংশ নারী সাংবাদিক কাজ করেন। রেডিও-টেলিভিশনের ৬০ শতাংশেরও বেশি উপস্থাপক নারী। গত ১০ বছরে বাংলাদেশে নারী সাংবাদিকদের কাজের বৈচিত্র্য বেড়েছে বহুমাত্রিক। সাংবাদিকতার পরিধি এখন শুধু সংবাদপত্র, রেডিও এবং টেলিভিশন চ্যানেলেই সীমাবদ্ধ নেই; সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এফএম রেডিও, কমিউনিটি রেডিও, অনলাইন, ডিজিটাল মিডিয়া ও ইউটিউব চ্যানেল। প্রতিটি মাধ্যমই এখন নারী সাংবাদিকদের দৃপ্ত পদচারণায় মুখর।
গণমাধ্যমে নারী সাংবাদিকদের অংশগ্রহণ বাড়ার পাশাপাশি বেড়েছে চ্যালেঞ্জও। এক সময় গণমাধ্যমে রিপোর্টিং বিভাগে নারীর কাজের জন্য ছিল নির্দিষ্ট কয়েকটি বিট। এগুলো হলো- নারী-শিশু ও বিনোদন বিভাগ। তবে গত দশ বছরে ঝুঁকিপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং সব সেক্টরে রাত-দিন সমানতালে কাজ করছেন নারীরা। সংবাদ প্রকাশের জেরে জেল-জুলুমও খেটেছেন অনেক নারী। বিভিন্ন গণমাধ্যমে সাব-এডিটর, ভিডিও এডিটর, প্রযোজক, নিউজ ও টকশো উপস্থাপনা এবং বার্তা সম্পাদক হিসেবেও কাজ করছেন অনেক নারী। তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত পিআইডি গাইড হিসেবে পরিচিত টেলিফোন নির্দেশিকার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ইংরেজি, বাংলা ও অনলাইন পত্রিকাসহ প্রায় ২০০ গণমাধ্যমে কর্মরত নারী সম্পাদক রয়েছেন ৬ জন। তবে তাদের সবাই সম্পাদক হয়েছেন মালিকানা সূত্রে, সাংবাদিকতার সূত্রে নয়। তালিকাভুক্ত ২৫টি টেলিভিশনের মধ্যে নারী সিইও রয়েছেন একটিতে, নারী বার্তাপ্রধান রয়েছেন দুটিতে। যেভাবে নারীরা এখন সাংবাদিকতায় আসতে শুরু করেছেন, আগামীতে সাংবাদিকতার শীর্ষ পদগুলোতেও নারীর সংখ্যা বাড়বে বলে আশা করা যায়। এমনকি সাংবাদিকদের সংগঠনগুলোতেও নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে।
ডিপ্লোমেটিক করেসপনডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও উইমেন জার্নালিস্ট নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (ডব্লিউজেএনবি)-এর সমন্বয়কারী সাধারণ সম্পাদক আঙ্গুর নাহার মন্টির মতে, ‘নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়ে বলতে গেলে বাংলাদেশে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। এমন অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে, যেখানে নারীরা এগিয়ে রয়েছেন। আমরা বৈশ্বিকভাবেও এর জন্য গর্ববোধ করি। তবে এটাও সত্যি, এখনো সাংবাদিকতায় নারীরা খুব একটা এগোয়নি। কিছু মিডিয়ায় নারীকে কখনো ভিকটিম, কখনো পণ্য হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এর বিপরীত চিত্রও রয়েছে। নারীরা বিভিন্ন চ্যালেঞ্জিং সেক্টরে অসাধারণ কাজও করছে। নিজের পরিবারকে পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে দিন-রাত যে প্রতিষ্ঠানের জন্য শ্রম দিচ্ছেন, মেধার সাক্ষর রাখছেন; সে অনুযায়ী মূল্যায়ন তারা পাচ্ছেন না। ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতিবঞ্চিত হওয়াসহ অনেক সময় নানা অজুহাতে চাকরি হারানোর ঝুঁকিতেও রয়েছেন নারী সাংবাদিকরা।’
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ডয়চে ভেলের রিপোর্ট অনুযায়ী, জাতীয় প্রেস ক্লাবের ২ হাজারের বেশি সাংবাদিকের মধ্যে নারী সাংবাদিকের সংখ্যা মাত্র ৭২ জন। এ ছাড়া ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের দুটি ফোরামে প্রায় ৬ হাজার সদস্যের মধ্যে নারী সাংবাদিকের সংখ্যা ১৫০ জনের বেশি নয়। বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সাংগঠনিক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত রয়েছেন সারা দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করা প্রায় ৫০০ নারী সাংবাদিক। এ ছাড়া টেলিভিশন সাংবাদিকদের সংগঠন ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টারের (বিজেসি) তালিকাভুক্ত প্রায় ১৭০০ সদস্যের মধ্যে ৭০০ই নারী।
উপমহাদেশের প্রথম সচিত্র নারী সাপ্তাহিক ‘বেগম’ পত্রিকা। সেই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন নূরজাহান বেগম। বাংলাদেশ তো বটেই, উপমহাদেশের নারী সাংবাদিকতার তিনি পথিকৃৎ। তার হাত ধরেই এ দেশের সাংবাদিকতায় নারীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ থেকে সম্পাদনা- সমস্ত যাত্রা শুরু হয়। যে সময়ে সমাজব্যবস্থায় নারীর ছবি তোলাও ছিল এক রকম নিষিদ্ধ। সেই সময়ে সচিত্র সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ কতখানি দুরূহ ছিল তা সহজেই অনুমেয়। নূরজাহান বেগম কেবল ‘বেগম’ সম্পাদনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, তিনি পত্রিকাটিকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন নারীর একান্ত কণ্ঠস্বর হিসেবে। নারী জাগরণ, নারী স্বাধীনতা, নারী অধিকার থেকে শুরু করে নারীর ভাবনাচিন্তা এবং সৃজনশীলতাও উঠে এসেছে ‘বেগম’ পত্রিকায়। বেগমে উঠে আসত নারীর নানা সমস্যা, জন্মনিরোধ, পরিবার-পরিকল্পনা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েদের জীবনবোধ নিয়ে লেখা চিঠিও। ফলে নারী প্রগতির বার্তা বহনকারী হয়ে উঠেছিল বেগম।
সাংবাদিকতা পেশায় যত প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জ থাক না কেন- নারী সাংবাদিকতার অগ্রপথিক নূরজাহান বেগম, সেলিনা পারভীন ও লায়লা সামাদের পথ অনুসরণ করে তরুণ প্রজন্মের নারীরাও সাংবাদিকতায় নিজেদের প্রমাণ করেছেন। আগামীতেও তাদের সফলতার এই ধারা অব্যাহত থাকবে- এমনই প্রত্যাশা সবার।