লামিনে ইয়ামাল। ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বকাপ ফুটবলের মঞ্চে প্রতি আসরে তরুণ প্রতিভার জয়জয়কার দেখা যায়। এই তরুণ খেলোয়াড়রা রাতারাতি বিশ্বমঞ্চে তারকা হয়ে ওঠেন না। এর পেছনে রয়েছে বিভিন্ন নামি ক্লাবের যুব একাডেমির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কঠোর প্রশিক্ষণ। স্পেনের বার্সেলোনার ‘লা মাসিয়া’ কিংবা রিয়াল মাদ্রিদের ‘লা ফাব্রিকা’র মতো একাডেমিগুলো বছরের পর বছর ধরে বিশ্ব ফুটবলে মানসম্পন্ন খেলোয়াড় সরবরাহ করে আসছে। একই ভূমিকা রাখছে লাতিন আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী ক্লাবগুলোও। ফুটবলার তৈরির এই আঁতুড়ঘরগুলোর নেপথ্য গল্প নিয়ে থাকছে আজকের আয়োজন।
খেলোয়াড় তৈরির সবচেয়ে সফল কারখানা হিসেবে পরিচিত বার্সেলোনার লা মাসিয়া। ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই আবাসিক একাডেমি থেকে বিশ্বমানের অসংখ্য ফুটবলার বের হয়েছেন। লিওনেল মেসি, জাভি হার্নান্দেজ, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা ও সার্জিও বুসকেতসের মতো কিংবদন্তিরা এই একাডেমিরই অবদান। ২০১০ সালের বিশ্বকাপজয়ী স্পেন দলের মূল চালিকাশক্তি ছিল এই লা মাসিয়া। বর্তমান সময়েও লামিন ইয়ামাল, গাভি কিংবা পাউ কুবার্সির মতো তরুণ ফুটবলাররা এই একাডেমি থেকে উঠে এসে আন্তর্জাতিক স্তরে পারফর্ম করছেন। লা মাসিয়া মূলত খেলোয়াড়দের ছোটবেলা থেকে নির্দিষ্ট ফুটবল দর্শন, পজিশনাল সেন্স এবং পাসিং গেমের নিখুঁত দীক্ষা দেয়।
অন্যদিকে রিয়াল মাদ্রিদের একাডেমি লা ফাব্রিকাও প্রতিভার জোগানে দারুণ সফল। লা মাসিয়া যেখানে নিজেদের মূল দলের জন্য বেশি খেলোয়াড় তৈরি করে, লা ফাব্রিকা সেখানে পুরো ফুটবল বিশ্বের জন্য প্রতিভার জোগান দেয়। রিয়াল মাদ্রিদের যুব একাডেমি থেকে তৈরি হওয়া ফুটবলাররা স্পেনের জাতীয় দলসহ ইউরোপের বিভিন্ন শীর্ষ লিগে নিয়মিত খেলছেন। দানি কারভাহাল, নাচো ফের্নান্দেজ, আলভারো মোরাতা বা আশরাফ হাকিমির মতো তারকা ফুটবলাররা এই একাডেমিরই সৃষ্টি। এই একাডেমি খেলোয়াড়দের শারীরিক ও মানসিক শক্তিমত্তা, আধুনিক ফুটবল কৌশল এবং তীব্র প্রতিযোগিতামূলক মনোভাবের ওপর বেশি জোর দেয়।
ইউরোপের পাশাপাশি লাতিন আমেরিকার একাডেমিগুলো বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় সাপ্লাই চেইন হিসেবে কাজ করে। ব্রাজিলের সান্তোস বা ফ্লামেঙ্গো এবং আর্জেন্টিনার রিভার প্লেট ও বোকা জুনিয়র্সের মতো ক্লাবগুলো ফুটবলারদের আসল খনি। পেলে ও নেইমারের মতো বিশ্বসেরা ফুটবল তারকাদের উপহার দিয়েছে সান্তোস একাডেমি। ২০২২ সালের বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা দলের এনজো ফার্নান্দেস বা হুলিয়ান আলভারেসের মতো তারকারা উঠে এসেছেন রিভার প্লেটের একাডেমি থেকে। লাতিন আমেরিকার এই একাডেমিগুলো মূলত তরুণদের সহজাত খেলার শৈলী, বল নিয়ন্ত্রণ এবং অসাধারণ ড্রিবলিং দক্ষতাকে পেশাদার রূপ দেয়।
এই একাডেমিগুলোর সফলতার পেছনে রয়েছে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও আধুনিক কার্যপদ্ধতি। তাদের শক্তিশালী স্কাউটিং নেটওয়ার্ক খুব অল্প বয়সে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রতিভাবান শিশুদের খুঁজে বের করে। সাধারণত ১০ থেকে ১২ বছর বয়সে শিশুদের এই একাডেমিগুলোয় ভর্তি করা হয়। সেখানে শুধু ফুটবল খেলা নয়, তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, শারীরিক বৃদ্ধি এবং সুষম পুষ্টির বিষয়েও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। পেশাদার ফুটবলার হওয়ার পাশাপাশি শৃঙ্খলা ও মানসিক দৃঢ়তা শেখানো এই একাডেমিগুলোর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিভিন্ন স্তরের কঠোর পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে যখন কোনো তরুণ খেলোয়াড় গোল করেন, তখন পুরো বিশ্ব তার প্রশংসায় মেতে ওঠে। কিন্তু সেই গোলের মূল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় অনেক বছর আগে, কোনো এক যুব একাডেমির কর্দমাক্ত মাঠে। ফুটবল এখন কেবল একটি খেলা নয়, এটি একটি বিশাল নিয়মতান্ত্রিক শিল্প। আর এই শিল্পের মূল কাঁচামাল জোগান দেয় লা মাসিয়া বা লা ফাব্রিকার মতো বিশ্বস্ত একাডেমিগুলো। এই আঁতুড়ঘরগুলো কার্যকর আছে বলেই বিশ্ব ফুটবল নিয়মিত নতুন নতুন মহাতারকার দেখা পায়। যুব ফুটবল সংস্কৃতির এই ধারাবাহিকতা বিশ্বকাপ ফুটবলকে চিরতরুণ, গতিশীল ও আকর্ষণীয় করে রাখে।