সাধারণ রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে গত বছরের এপ্রিল থেকে ফেনীর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ‘বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবা’ চালু করা হয়। শুরুর দিকে ঠিকঠাক চললেও কয়েক মাস পরই কার্যক্রমটি হোঁচট খায়। রোগীরা বিকেলে হাসপাতালে এসেও চিকিৎসক না পেয়ে অনেক সময় ফিরে যান।
গত তিন দিন আগে থেকে কার্যক্রমটি একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসকরা বলছেন, ‘বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবা’ দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে তাদের যে ভাতা দেওয়ার কথা ছিল, তা গত ছয় মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। তাই তারা মনের বিরুদ্ধে আর সেবা দিতে চান না। যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, চিকিৎসকসংকটের কারণে আপাতত সেবাটি বন্ধ রয়েছে। নতুন করে চিকিৎসক পদায়ন না হলে এই স্বাস্থ্যসেবা বন্ধ থাকবে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে চিকিৎসা দেওয়ার কথা। এতে সিনিয়র কনসালট্যান্টের পরামর্শ ফি ৪০০, জুনিয়র কনসালট্যান্টের ৩০০ টাকা ও এমবিবিএস-বিডিএসের চিকিৎসকদের ফি ২০০ টাকা নির্ধারণ করে সরকার। নির্ধারিত ফির একটি অংশ পাওয়ার কথা চিকিৎসক ও সহযোগীদের। আরেকটি অংশ পাওয়ার কথা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। কিন্তু গত ছয় মাস হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসকদের ফির দেয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেন, ‘সকাল থেকে রোগী দেখতে হয়। একবার আউটডোর, আরেকবার ওয়ার্ড, এভাবেই কাজ করতে হয়। সরকারি হাসপাতাল হওয়ায় আউটডোরে সব সময় রোগীর ভিড় থাকে। বিকেলে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে রোগী দেখলে যে টাকা পাওয়া যায়, তার চেয়ে অনেক কম পাওয়া যায় বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবায়। ওই টাকাও গত ছয় মাস ধরে পাচ্ছি না। টাকা না পেলে কেন আমরা বাড়তি সেবা দেব।’
চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. ব্রজ গোপাল বলেন, ‘আমাকে মাসে এক দিন বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবায় চেম্বার করতে হয়। সরকারনির্ধারিত ফির একটা অংশ সম্মানী হিসেবে চিকিৎসকরা পেয়ে থাকেন। গত কয়েক মাস চিকিৎসকরা কেউই ওই টাকা পাচ্ছেন না। টাকা কেন দেওয়া হচ্ছে না তাও অজানা।’
ফেনী জেনারেল হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অর্থো সার্জারি) জামাল উদ্দিন বলেন, ‘টাকা না পাওয়ায় চিকিৎসকরা মনের বিরুদ্ধে চেম্বার করেন। এটা খুব স্বাভাবিক, পারিশ্রমিক ছাড়া কেউ পরিশ্রম করতে চান না।’
শারমিন আক্তার নামে এক রোগী বলেন, ‘জেলার একমাত্র সরকারি হাসপাতাল হওয়ায় সকালে অনেক রোগীর চাপ থাকে। সময় শেষ হয়ে যাওয়ায় অনেক রোগীকে ডাক্তার দেখতে পারেন না। বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবা ঠিকঠাক চালু থাকলে এসব রোগী চিকিৎসা নিতে পারতেন।’
লামিয়া আক্তার নামে আরেক রোগী বলেন, ‘গরিবের সব দিক থেকে কপাল পোড়া। বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবা চালু হওয়ায় আমাদের মতো গরিবদের উপকার হচ্ছিল। সুবিধাভোগীদের সেটাই সহ্য হচ্ছে না। তাই নানা অজুহাতে তারা সেবা কার্যক্রমটি বন্ধ করে দিতে উঠেপড়ে লেগেছে।’
এ বিষয়ে হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আসিফ ইকবাল বলেন, ‘এমনিতেই হাসপাতালে চিকিৎসকসংকট, এর মধ্যে সম্প্রতি ৬-৭ জন চিকিৎসককে বদলি করা হয়েছে। এ কারণে বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবা বন্ধ রাখা হয়েছে। নতুন করে চিকিৎসক পদায়ন না হলে এই স্বাস্থ্যসেবা বন্ধ থাকবে।’
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আবুল খায়ের মিয়াজি বলেন, ‘বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবা বন্ধ, কথাটি পুরোপুরি ঠিক নয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের কারণে এটি আপাতত বন্ধ বা ধীরগতিতে চলছে। যে অর্ডারের ভিত্তিতে এতদিন সেবা কার্যক্রম চলে আসছিল, সেটি পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। এ জন্য সেবা কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে।’
কেন চিকিৎসকদের পরামর্শ ফি দেওয়া হচ্ছে না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রথমে যে প্রজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল, শুরুতে আমরা সে অনুযায়ী চিকিৎসকদের টাকা দিয়েছি। ওই আদেশের বিরুদ্ধে এখন আবার আমাদের নিষেধ করা হয়েছে, তাই বন্ধ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া কে কত টাকা পাবেন, সেটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্রের মাধ্যমে নতুন আরেকটি প্রজ্ঞাপন হবে। সবাইকে সে অনুযায়ী টাকা দেওয়া হবে। এখন সব টাকাই সংরক্ষিত আছে। আদেশ পেলে সবাইকে টাকা দেওয়া হবে।