বর্তমানে শাখাবিহীন ব্যাংকিংয়ে ঝুঁকছে ব্যাংকগুলো। এতে একদিকে ব্যাংকের খরচ কমছে অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতিও চাঙা হচ্ছে। ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের প্রচার ও প্রসার। চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিক শেষে এজেন্টের সংখ্যার পাশাপাশি বেড়েছে আমানত, ঋণ বিতরণ ও রেমিট্যান্স আহরণসহ সব ধরনের কার্যক্রম। এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রমে পুরুষদের তুলনায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। অর্থাৎ এই উদ্ভাবনী পদ্ধতিটি গ্রামীণ এলাকার মানুষের বিশেষ করে নারীদের ক্ষমতায়ন, বিভিন্ন আর্থিক কর্মকাণ্ডে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে নারী এজেন্ট এবং হিসাব সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রামীণ এলাকার তুলনায় শহরাঞ্চলে নারী এজেন্টের সংখ্যা বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি মার্চে নারী এজেন্টের সংখ্যা ৪৮ জন বেড়েছে। এর মধ্যে শহরাঞ্চলে বেড়েছে ১০ দশমিক ১ শতাংশ এবং গ্রামীণ এলাকায় ২ দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। নারীদের আমানত এবং ঋণ হিসাবও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে আমানতের পরিমাণও।
ব্যাংকের শাখা না থাকলেও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে এখন সারা দেশের মানুষ ব্যাংকিং সেবা পাচ্ছে। পরিচালন ব্যয় কমাতে বর্তমানে ব্যাংকগুলো শাখার পরিবর্তে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মতো বিকল্প সেবার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। এতে গ্রামীণ মানুষ আরও বেশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারছেন। এজেন্ট ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এখন সহজেই ব্যাংকে টাকা জমা রাখতে পারছে। প্রয়োজনে ঋণও নিতে পারছে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থও সহজে পৌঁছে যাচ্ছে সুবিধাভোগীদের কাছে। এর মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা ছড়িয়ে পড়ছে গ্রামগঞ্জে। চাঙা হচ্ছে প্রত্যন্ত এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য। এর ফলে শক্তিশালী হচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি।
৪১ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, মূলত গ্রামীণ জনগোষ্ঠীই এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে আমানত রাখছেন। চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিক শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে আমানত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩৪ হাজার ৪৭৮ কোটি টাকা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর। আর শহরাঞ্চলের আমানতের পরিমাণ ৮ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা। এসব আমানতের ৮১ দশমিক ৩৬ শতাংশ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর। মার্চ প্রান্তিক শেষে ঋণ বিতরণও বেড়েছে। এ সময় মোট ঋণ বিতরণের পরিমাণ ১০ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে শহরে বেড়েছে ৫১ শতাংশ আর গ্রামে বেড়েছে মাত্র ৪ শতাংশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৩১টি ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব ব্যাংকের মোট এজেন্টের সংখ্যা ১৫ হাজার ৮৩৮টি, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ১ দশমিক ১ শতাংশ কম। এসব এজেন্টের ৮৬ শতাংশ ও আউটলেটের ৮৭ শতাংশই গ্রামে।
জানা গেছে, দেশের সুবিধাবঞ্চিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ব্যাংকিং সুবিধা পৌঁছে দিতেই ২০১৪ সালে চালু হয় এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম। এ জন্য বাড়তি চার্জ গুনতে হয় না গ্রাহককে। ব্যাংকের ডেবিট কার্ড ব্যবহারের সুযোগও পাচ্ছেন তারা। ফলে এই সেবা দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরিচালন ব্যয় কম হওয়ায় এখন ব্যাংকগুলোও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে মনোযোগ দিচ্ছে। এতে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে প্রতিনিয়ত বাড়ছে গ্রাহক সংখ্যা, সেই সঙ্গে বাড়ছে লেনদেনের পরিমাণও।
এই প্রসঙ্গে ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের দেশের বিরাট জনগোষ্ঠী এখনো ব্যাংকিং সেবার বাইরে রয়েছে। তাদের ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে এজেন্ট ব্যাংকিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। গত ৯ বছরে এই এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। কেননা এর মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহ অনেক বেড়েছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে এজেন্ট ব্যাংকিং আগামী দিনে আরও বড় ভূমিকা রাখবে।
এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে একদিকে কোনো খরচ ছাড়াই ব্যাংকের লাভ করার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে ব্যাংকের গ্রাহক সংখ্যাও বাড়ছে কোনো খরচ ছাড়াই। আর গ্রাহকরাও সহজেই এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারছেন এবং তাদের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছেন।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, গ্রামীণ সুবিধাবঞ্চিত পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কাছে ব্যাংকিং সুবিধা পৌঁছে দিতে এজেন্ট ব্যাংকিং চালুর উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলোর আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। সঠিকভাবে পরিচালনা করলে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রমের মাধ্যমে সারা বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি ঘরে ঘরে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। এ ছাড়া এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সংগৃহীত আমানতের অর্থে সিংহভাগ গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগের সুযোগ করা গেলে তা গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা আরও শক্তিশালী ও সচল রাখতে, বিশেষ করে গ্রামের নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে বলে মন্তব্য করেন তারা। আগামী দিনে সেই চেষ্টাই করা হবে বলেও জানান তারা।
জানা গেছে, ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর এজেন্ট ব্যাংকিং নীতিমালা জারির পর ২০১৪ সালে প্রথম এ সেবা চালু করে বেসরকারি খাতের ব্যাংক এশিয়া। এখন পর্যন্ত এ সেবায় শীর্ষে অবস্থান করছে বেসরকারি খাতের ডাচ-বাংলা ব্যাংক। এরপরই রয়েছে ব্যাংক এশিয়া এবং ইসলামী ব্যাংক।
প্রসঙ্গত, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে হিসাব খোলা, টাকা জমা ও উত্তোলন, টাকা স্থানান্তর (দেশের ভেতর), রেমিট্যান্স উত্তোলন, বিভিন্ন মেয়াদি আমানত প্রকল্প চালু, ইউটিলিটি সার্ভিসের বিল পরিশোধ, বিভিন্ন প্রকার ঋণ উত্তোলন ও পরিশোধ এবং সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় সরকারি সব ধরনের ভর্তুকি গ্রহণ করা যায়। এজেন্টরা কোনো চেক বই বা ব্যাংক কার্ড ইস্যু করতে পারে না। এজেন্টরা বৈদেশিক বাণিজ্যসংক্রান্ত কোনো লেনদেনও করতে পারেন না। এ ছাড়া এজেন্টদের কাছ থেকে কোনো চেকও ভাঙানো যায় না। মোট লেনদেনের ওপর পাওয়া কমিশন থেকেই এজেন্টরা আয় করেন।