ফুটপাত নাগরিকদের স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটাচলার জায়গা। কিন্তু অধিকাংশ ফুটপাত এখন হকারদের দখলে। পথচারীদের ফুটপাত দিয়ে হাঁটার স্বাভাবিক পথ প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম। কোথাও সারি সারি দোকান, কোথাও নানা ধরনের নির্মাণসামগ্রীর স্তূপ, কোথাওবা পরিত্যক্ত যানবাহন। যেখানে সেখানে হুটহাট উঠে যায় মোটরসাইকেল, রিকশা, সিনএনজিচালিত অটোরিকশা। মাঝেমধ্যে কোনো কোনো ফুটপাতে দেখা যায় প্রাইভেট কারও। খবরের কাগজের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমনই চিত্র। যেসব ফুটপাত দোকানিদের দখলে থাকে নিয়মিত, সেই এলাকায় রীতিমতো চলে চাঁদাবাজি, মাসোহারা। এমনকি বিশেষ কায়দায় ইজারা দেওয়ার ঘটনাও আছে। এসব চাঁদা আদায়ে স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন থেকে শুরু করে প্রশাসনের প্রভাবশালীদের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধেও।
রাজধানী ঢাকায় প্রয়োজনের তুলনায় ৫ ভাগের ১ ভাগ ফুটপাত থাকলেও সেগুলোও বেদখল হয়ে আছে। বাকিটা ভাঙাচোরা। শহরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের ৭১.৭২ শতাংশই পথচারী। সরকারের পরিবহন পরিকল্পনায় পথচারীদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন বলেই মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও সড়ক পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করেন, নতুন নির্মাণের জন্য সদ্য নির্মিত ফুটপাত ভেঙে ফেলা, হকারদের বেশির ভাগ ফুটপাত দখল করে দোকান বসানো এবং অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে পথচারীদের জীবন প্রতিনিয়ত ঝুঁকিতে পড়ছে।
২০১৫-২০৩৫ সালের প্রণীত সরকারের সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (আরএসটিপি) উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে প্রতিদিন ঢাকাবাসী এক স্থান থেকে আরেক স্থানে গড়ে ৪ কোটি ২০ লাখ বার যাতায়াত (ট্রিপ) করে। আর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) বলছে, ৪ কোটি ২০ লাখ বার যাতায়াতের ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে মানুষ হেঁটে গন্তব্যে যান। প্রতিদিন অন্তত আড়াই কিলোমিটার হাঁটেন ৩৫-৪০ শতাংশ সড়ক ব্যবহারকারী। বুয়েটের গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, যোগাযোগ অবকাঠামোগুলো পথচারীবান্ধব না হওয়ায় পথচারীরাই দুর্ঘটনায় পড়েন বেশি। সরকারের সংশোধিত আরএসটিপিতে মোট বিনিয়োগের মাত্র ০.২৪ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে দেড় কোটি পথচারীর ফুটপাত উন্নয়নে। এটি প্রয়োজনের তুলনার ভগ্নাংশ পরিমাণ বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ঢাকা শহরে ২ হাজার ৬০০ কিলোমিটার ফুটপাত দরকার। কিন্তু আছে মাত্র ৫১৫ কিলোমিটার। এই ফুটপাতও অমসৃণ, আঁকাবাঁকা বা অনাবৃত ড্রেন এবং ম্যানহোলের সমন্বয়ে গঠিত।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের এক গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকায় দুই সিটি করপোরেশনের ফুটপাতে হকারদের কাছ থেকে বছরে ২ হাজার ১৬০ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। ফুটপাতে যে শুধু ছোট ব্যবসা করা হয় তাই নয়, গুলিস্তান, নিউ মার্কেট ও মিরপুরের মতো ব্যস্ত এলাকায় ফুটপাত দখল করে রীতিমতো বাজার গড়ে তোলা হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সহসভাপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ফুটপাতব্যবস্থার উন্নতির জন্য বিনিয়োগও খুব কম লাগে। এটা হাতিরঝিল এবং ধানমন্ডি লেকে স্পষ্ট ছিল। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ফুটপাতের সুবিধার উন্নয়নে আগ্রহী নয় বলে মনে হয়।
ফুটপাত দখলমুক্ত করতে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে একযোগে কাজ করতে হবে এবং তাদের উদ্যোগে শতভাগ স্বচ্ছতা থাকতে হবে। ফুটপাত স্থানীয় রাজনীতি ও অবৈধভাবে টাকাপয়সার লেনদেন থেকে মুক্ত রাখতে হবে। ঢাকা মহানগরীর বিপুলসংখ্যক হকারকে পুনর্বাসন করতে সরকারকে বিভিন্নমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা কঠিন হয়ে যাবে। ফুটপাত পথচারীদের চলাচলের স্বাধীনতার অন্যতম জায়গা হয়ে উঠুক, সেই প্রত্যাশা সবার।