খাদ্য ও ওষুধে ভেজাল। মহাবিপদে জনস্বাস্থ্য। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরীক্ষায় প্রতিবছরই খাদ্যপণ্যে বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত উপাদানের প্রমাণ মেলে। একইভাবে ভেজালের প্রমাণ পাওয়া যায় ওষুধেও। বিভিন্ন অভিযানে তা ধরাও পড়ে। মাত্র কয়েক দিন আগেই ঢাকার অদূরে সাভারে আটার সঙ্গে কাপড়ের রং মিশিয়ে সস বানানোর সময় হাতেনাতে ধরা পড়ে একটি চক্র। একইভাবে মিষ্টির দোকান থেকে সংগ্রহ করা পচা শিরা দিয়ে সন্দেশসহ বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি তৈরির সময়ও একইভাবে ধরা পড়ে আরেকটি চক্র। অজপাড়াগাঁয়ে নয়, খোদ রাজধানীর নিউ মার্কেটে সম্প্রতি কয়েকটি সংস্থার এক যৌথ অভিযানে মাংসে কাপড়ের রং মেশানোর প্রমাণ পাওয়া যায়। তখন ওই মাংসের দোকানের মালিককে নগদ ১ লাখ টাকা জরিমানাও করা হয়।
এসব ভেজাল ও দূষণযুক্ত খাদ্যের কারণে ক্যানসার, কিডনি, লিভার, হৃদরোগ, স্নায়ুরোগ ও ফুসফুসের রোগে মৃত্যু বাড়ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে এ ধরনের রোগে মৃত্যু বাড়ার ক্ষেত্রে ভেজাল খাদ্য বড় ভূমিকা রাখছে। সেই সঙ্গে উচ্চ ঝুঁকি তৈরি করছে মাতৃস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও। খাদ্যে এমন সব ভেজালের মিশ্রণ হরহামেশাই শনাক্ত হয়ে থাকে, যা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই বিপজ্জনক। বলা যায়, দেশে ভেজাল খাদ্য জনস্বাস্থ্যের জন্য মহাবিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ৬ হাজার ৮৪৫টি নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়। এতে ৭৭০টি নমুনায় মাত্রাতিরিক্ত বিষাক্ত উপাদান পাওয়া যায়।
ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় জানা যায়, একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী বিভিন্ন পদ্ধতিতে খাবারে ভেজাল দিচ্ছেন। এর মধ্যে সাধারণত কাদামাটি, নুড়িপাথর, বালি এবং মার্বেল চিপস মেশানো হয় খাদ্যদ্রব্যে। অন্যদিকে তরল খাদ্যে দেওয়া হয় রং এবং কম দামি রাসায়নিক; যা স্বাদ ভালো রাখে। তবে এসব ভেজাল সাধারণত খালি চোখে দেখা যায় না। আবার অনেক ক্ষেত্রে ঘ্রাণেও বোঝা যায় না।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদের খাদ্য মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে অসাধু ব্যক্তিদের অপরাধমূলক কার্যক্রম রোধকল্পে খাদ্যে ভেজালবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ জনস্বাস্থ্য সমিতির সভাপতি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ মনির হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, দেশে বড় কয়েকটি অসংক্রামক রোগের জন্য প্রধানত দায়ী ভেজালযুক্ত খাদ্য। একদিকে অধিক মুনাফার লোভে একশ্রেণির মানুষ খাদ্যে ভেজাল মেশায়, অন্যদিকে পরিবেশদূষণের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের রাসায়নিক যুক্ত হয়ে খাদ্যকে বিষাক্ত করে তোলে। এমন অনেক রাসায়নিক আছে, যা অধিকতর তাপেও নষ্ট হয় না। এগুলো মানুষের দেহে ঢুকলে তা আর বের হয় না। জমতে জমতে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেমিক্যালমিশ্রিত বা ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে তাৎক্ষণিক প্রভাব হিসেবে পেটব্যথাসহ বমি হওয়া, মাথা ঘোরা, হজম বিঘ্নিত হওয়া, শরীরে ঘাম বেশি হওয়া ও দুর্বল হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। মেটালবেইজড ভেজাল খাবারে কিডনি স্বল্পমাত্রা থেকে সম্পূর্ণ বিকল হতে পারে। অন্যদিকে অ্যালার্জি, অ্যাজমা, চর্মরোধ, উচ্চ রক্তচাপ, ব্রেনস্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাকও হতে পারে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতায় বিএসটিআইয়ের ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আটক পণ্য ল্যাবে পরীক্ষা করতে হবে। ভেজাল প্রতিরোধ করতে হবে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ রয়েছে, তাদেরও অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
সংস্থাগুলো তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলে বাজারে নকল, ভেজাল ও মানহীন পণ্য সহজে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না।
মানুষের সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিতে সরকারকে আরও দায়িত্বশীল হয়ে কাজ করতে হবে। একইভাবে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ রয়েছে, তাদেরও অভিযান পরিচালনা করার সক্ষমতা বাড়তে হবে।