মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ যেন একটু বেশিই। এর মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়লে জনগণের ওপর চাপ আরও ঘনীভূত হবে। মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) অনুপাতে বাংলাদেশে কর আদায় বিশ্বে সবচেয়ে কম। এর অন্যতম কারণ হলো কর অব্যাহতির পরিমাণ বেশি। বর্তমানে বাংলাদেশে জিডিপির তুলনায় কর অনুপাত ৯ শতাংশের নিচে। আইএমএফ এই অনুপাত কমপক্ষে ১২ শতাংশে উন্নীত করতে চায়। এ জন্য কর অব্যাহতি তুলে নিতে বলেছে সরকারকে। এমনিতেই মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে। বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়। আবার ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব পড়ে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুতের দাম বাড়লে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে। তাই এটি বছরে কয়েকবার বাড়ানো হলে বাজারে জিনিসপত্রের দাম নাগালের বাইরে চলে যাবে।
এমনিতেই সাধারণ মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে আছে। এত চাপ ভোক্তা নিতে পারবে না। বিদ্যুৎ খাতে মূল্য বৃদ্ধি করে পুরো ভর্তুকি সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত হবে আত্মঘাতী। তাই মূল্য বৃদ্ধি না করে বিদ্যুৎ খাতে যেসব অনিয়ম ও দুর্নীতি আছে, সেগুলো বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন খরচ কমিয়ে ভর্তুকি কমানো যেতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি অনুমোদন করে গত বছর জানুয়ারিতে। কিস্তিভিত্তিক এই ঋণ পাওয়ার জন্য রাজস্ব আয় বাড়ানো, কর অব্যাহতি কমানো, ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিতকরণ, টাকার বিনিময় হার নমনীয়সহ অনেক শর্ত দিয়েছে সংস্থাটি। তবে অন্যতম শর্ত হচ্ছে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমিয়ে আনা। সরকার তাদের এই শর্ত মেনে নিয়েছে এবং বছরে চার দফা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কীভাবে এই দাম সমন্বয় করা হবে, তার একটি পরিকল্পনাও দিয়েছে আইএমএফের কাছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী তিন বছর বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমিয়ে আনা হবে।
সংকট থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হবে বলে আশা প্রকাশ করেছে সফররত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল মিশন। সংস্থাটি বলেছে, আমদানি সংকোচন ও নীতি সুদহার কঠোরসহ বেশ কিছু সংস্কার পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এসব পদক্ষেপের ফলে দেশটির অর্থনীতি ক্রমশ স্থিতিশীল হবে। বাংলাদেশের আর্থিক খাতে চলমান গৃহীত সংস্কার কর্মসূচিতে আইএমএফ সন্তুষ্ট। অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি দায়িত্বশীল সূত্র খবরের কাগজকে জানায়, বাংলাদেশ ঋণের তৃতীয় কিস্তির টাকা পেতে প্রায় সব শর্ত পূরণ করেছে এবং জুন মাসে এই ঋণ ছাড় হবে। তৃতীয় কিস্তিতে বাংলাদেশ ৬৮ কোটি ১০ লাখ ডলার পেতে পারে।
বিবৃতিতে আইএমএফ বলেছে, সুদের হার উদারীকরণ, মুদ্রানীতিতে অতিরিক্ত কড়াকড়ি আরোপ ও বিনিময় হার সংস্কারের ফলে মূল্যস্ফীতিতে চাপ কমাতে সহায়তা করবে। আইএমএফ বলেছে, ভবিষ্যতে যদি মূল্যস্ফীতির চাপ তীব্র হয়, তা হলে নীতি সুদহার আরও কঠোর করার উদ্যোগ নিতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংককে।
সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের ঊর্ধ্বতন গবেষণা পরিচালক ড. জায়েদ বখত বলেন, রাজস্ব আদায়ে বড় দুর্বলতা আছে। কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় করতে পারলে ভর্তুকির ওপর এত বেশি চাপ আসত না। আইএমএফের সব পরামর্শ মেনে চলার দরকার পড়ত না। তিনি বলেন, দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ রয়েছে। বিদ্যুতের দাম বাড়লে এই চাপ আরও বাড়বে। ফলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে। ভর্তুকির চাপ সামলাতে হবে। তবে সেটি সহনীয়ভাবে।
মূল্যস্ফীতির প্রভাব থেকে জনগণকে মুক্ত রাখতে সরকারকেই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কোন কোন উৎস থেকে রাজস্ব আদায় বাড়ানো হবে তা ঠিক করতে হবে। ধনিক শ্রেণির কাছ থেকে প্রত্যক্ষ কর আদায়ে বেশি মনোযোগী হতে হবে। কৃষি খাতে ভর্তুকি কমানো যাবে না। কাজেই সব দিক বিচার-বিশ্লেষণ করে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সঠিক সময়ে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে জনজীবনের ওপর থেকে মূল্যস্ফীতির চাপ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।