কলেরা ও ডায়রিয়া একই ধরনের পানিবাহিত রোগ। দেশে প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হচ্ছে এবং ৩ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার প্রকাশ্যে কলেরার কথা স্বীকার করতে চায় না, কিন্তু ঠিকই গোপনে কলেরা নিয়ে কাজ করছে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরছে দেশে কলেরার প্রাদুর্ভাব নিয়ে। বাংলাদেশ সরকারের বিএমজিএফ তহবিলের মাধ্যমে পরিচালিত দেশে কলেরা নিয়ে সার্ভেইলেন্সের সর্বশেষ একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে দেশে কলেরা রোগ খুবই কম প্রকাশ করা হয় ট্রেড ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার ভয়ে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ৬ কোটি ৬৪ লাখের বেশি মানুষ কলেরা ঝুঁকিতে রয়েছে। বছরে কলেরায় আক্রান্ত হয় আনুমানিক ১ লাখ ৯ হাজারের বেশি মানুষ এবং মৃত্যু হয় ৩ হাজার ২৭২ জনের। আইসিডিডিআরবির হাসপাতালে ডায়রিয়ার চিকিৎসা করতে আসা ২০ শতাংশ রোগী থাকেন কলেরায় আক্রান্ত। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০৩০ সালের মধ্যে কলেরামুক্ত করার অঙ্গীকারবদ্ধ ২০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুসারে বর্তমানে ২৩টি দেশে কলেরার প্রাদুর্ভাব রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে যুক্ত গ্লোবাল টাস্কফোর্স অন কলেরা কন্ট্রোল (জিএফসিসি) বাংলাদেশ সরকারের আইইডিসিআর ও বেসরকারি আন্তর্জাতিক সংস্থা আইসিডিডিআরবি যৌথভাবে এই সার্ভেইলেন্স কার্যক্রম পরিচালনা করে।
গবেষণার তথ্য মতে, ২০০০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত শহরে ও গ্রামীণ পর্যায়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ভি কলেরি পজিটিভ রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল ১৫ থেকে ৬০ বছর বয়সের রোগী। সেই সঙ্গে দেখা গেছে, গত ২০ বছরে গ্রামীণ এলাকায় কলেরার প্রাদুর্ভাব ৩৯ দশমিক ১১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬২ দশমিক ৯৩ শতাংশে উঠেছে। শহরে তা ৪৯ দশমিক ১৫ শতাংশ থেকে বেড়ে উঠে যায় ৭১ দশমিক ০৮ শতাংশে। বাংলাদেশে প্রতিবছর আনুমানিক ১ লাখের বেশি মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হয়।
বাংলাদেশ সেই দেশগুলোর মধ্যে একটি, যেখানে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ কলেরার ঝুঁকিতে রয়েছে। কলেরার প্রবণতা, কলেরা রোগের বেজলাইন, ক্লিনিক্যাল বৈশিষ্ট্যগুলোর পার্থক্য এবং ভিব্রিও কলেরির ক্লিনিক্যাল পর্যবেক্ষণ ধরে গবেষণা করা হয়। এ ক্ষেত্রে আইসিডিডিআরবির ঢাকা এবং চাঁদপুরের মতলব হাসপাতালের তথ্য ব্যবহার করা হয়। এতে দেখা যায়, ২০ বছরের নারী রোগীদের মধ্যে ৪৩ শতাংশ শহরে এবং ৫১ দশমিক ৬ শতাংশ গ্রামীণ এলাকার। ৫০ শতাংশের বেশি রোগীর পরিবার দরিদ্র এবং নিম্নমধ্যবিত্ত পর্যায়ের। শহর এলাকায় ৩০ শতাংশ পরিবার অপরিশোধিত পানীয় জল ব্যবহার করেছে এবং ৯ শতাংশ পরিবারের বাইরে আঙিনায় বর্জ্য ছিল। উঠানে বর্জ্য ফেলার কারণে কলেরার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে ভি কলেরি ছাড়াও গ্রাম ও শহরে উভয় এলাকায় অনূর্ধ্ব ৫ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ৯ দশমিক ৭ শতাংশ রোটা ভাইরাসে আক্রান্ত ছিল। এ ছাড়া শহরের ক্যাম্পাইলোব্যাক্টরের সঙ্গে ছিল ভি কলেরি।
গ্লোবাল টাস্ককোর্স অন কলেরা কন্ট্রোলের তথ্যানুসারে, আন্তর্জাতিক ৫০টিরও বেশি সংস্থাকে একত্রিত করে ২০৩০ সালের মধ্যে কলেরার মৃত্যু ৯০ শতাংশ কমাতে প্রচেষ্টা জোরদার করতে এবং অংশীদারত্ব জোরদার করার জন্য একটি নতুন কৌশল এবং বৈশ্বিক রোডম্যাপের আওতায় কাজ করছে। যার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।
আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, আমরা কলেরা প্রতিরোধে কাজ করে যাচ্ছি দীর্ঘদিন ধরে। ওরাল কলেরা ভ্যাকসিন ২ ডোজ নিলে পরবর্তী ৫ থেকে ৬ বছরের জন্য কলেরামুক্ত থাকা সম্ভব। শুধু ভ্যাকসিনই নয়, কলেরা থেকে সুরক্ষায় তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হচ্ছে সচেতনতা, প্রতিজন রোগী ব্যবস্থাপনা ও ওরাল ভ্যাক্সিন নেওয়া। রোগী ব্যবস্থাপনা নিয়েই অনেক দেশ হিমশিম খাচ্ছে। ব্যবস্থাপনায় গলদ থাকলে কলেরা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না বরং আক্রান্ত ও মৃত্যু বাড়ে। কলেরা নিয়ে অবহেলা নয় বরং সবাইকে সচেতন হতে হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে উদ্যোগী হয়ে কাজ করতে হবে। জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারের কার্যক্রম বাড়াতে হবে। তাহলে দেশ থেকে কলেরা নিয়ন্ত্রণ করা অনেকটাই সম্ভব হবে।