দেশে দিনে দিনে লবণাক্ত পানি ও মাটির এলাকা বাড়ছে। যার প্রভাব পড়ছে কৃষির ওপর। নানাভাবে চেষ্টা চলছে লবণসহিষ্ণু ফসল উৎপাদনের। কিন্তু লবণাক্ত এলাকা বৃদ্ধির ফলে সেই উদ্যোগেও বারবার ব্যাঘাত ঘটছে। আবার পানীয় জলে লবণাক্ততা দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ, প্রি-একলাম্পসিয়া, হৃদরোগ, শিশুমৃত্যুর হার বৃদ্ধির সঙ্গে লবণাক্ত পানির যোগসূত্র রয়েছে বলে দাবি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের। যদিও অর্থনৈতিকভাবে অনুকূল কিন্তু পরিবেশগতভাবে চিংড়ি চাষের ফলে কিছু এলাকার মানুষ ইচ্ছাকৃত পানি লবণাক্ত করছে। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের প্রভাবে স্থায়ী লবণাক্ত পানি ও মাটির এলাকা বেড়ে যায় বলেও জানান বিশেষজ্ঞরা।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০০০ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত প্রায় এক দশকে লবণাক্ত জমির পরিমাণ বেড়েছে আগের তুলনায় ৩৫ দশমিক ৫১ হাজার হেক্টর এবং অন্যদিকে চার দশকে ১৯৭৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত লবণাক্ত জমির পরিমাণ ২ লাখ ২৩ হাজারে হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা যায়, লবণাক্ত পানি প্রবেশের মাধ্যমে মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি দেশের দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিতে এক মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের ২৫ লাখ হেক্টর উপকূলীয় অঞ্চল। এর মধ্যে ১০ লাখ হেক্টরের বেশি জমি বিভিন্ন মাত্রায় লবণাক্ততায় আক্রান্ত। জলবায়ুর পরিবর্তন ও শুকনো মৌসুমে নদীর প্রবাহ ক্রমাগত কমে যাওয়ায় চট্টগ্রাম ছাড়া দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সর্বত্র ভূ-ভাগের অনেক গভীরে সমুদ্রের লোনা পানি প্রবেশ করে মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি করছে। ফলে মাটির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) সেচের পানির লবণাক্ততার অবস্থা পর্যবেক্ষণের লক্ষ্যে বিভিন্ন উপকূলীয় জেলায় ২০০ ফুটের ১৩০টি বোরহোল স্থাপন করে। তারা লবণাক্ততা মূল্যায়নের জন্য একটি বার্ষিক মনিটরিং সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করে দেখতে পায় লবণাক্ততা বাড়ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় একটি দল বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-মধ্য অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত অধ্যয়ন এলাকার গভীর জলজ/টিউবওয়েলে (গভীরতা ৫০০ ফুট) লবণাক্ততা খুঁজে পায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেতে পারে বিভিন্ন কারণে। বাংলাদেশের বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায় দুটি প্রাকৃতিক কারণে। জোয়ারের সময় লবণযুক্ত পানি জমিতে প্লাবিত হয়েও ভূগর্ভস্থ লবণাক্ত পানি কৈশিক রন্ধ্র দিয়ে মাটির ওপরে চলে আসার কারণে। সাধারণত শুকনো মৌসুমে লবণাক্ত জোয়ারের পানিতে বহু জমি তলিয়ে যায়। তখন লবণাক্ত পানি জমিতে ছড়িয়ে যায়। এ পানি সেচকাজে ব্যবহার করা হলে মাটি বা জমি লবণাক্ত হয়। অন্যদিকে বর্ষা শেষ হলে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাস থেকে মাটি শুকাতে শুরু করে। এর ফলে মাটিতে অনেক ফাটল সৃষ্টি হয়।
যখন মাটির ওপর রোদ পড়ে তখন মাটির উপরিস্তর থেকে পানি বাষ্পীভূত হয়ে উড়ে চলে যায় এবং ভূগর্ভস্থ লবণাক্ত পানি ওই ফাটল দিয়ে ভূমির উপরিস্তরে চলে আসে। ফলে জমির উপরিস্তর লবণাক্ততায় আক্রান্ত হয়। এ ছাড়া মনুষ্যসৃষ্ট কারণেও লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায়। লবণাক্ততার কারণে উদ্ভিদের বৃদ্ধি কমে যায়, ফুলের সংখ্যা হ্রাস পায়, অনেক ক্ষেত্রে পরাগায়ণও হয় না। এতে ফসলের ফলন বিভিন্ন মাত্রায় কমে যায়। মাটি লবণাক্ত হওয়ার কারণে মৃত্তিকা দ্রবণের ঘনত্ব বৃদ্ধি পায়। তখন অল্প ঘনত্বের গাছের রস চলে যায় মাটিতে। ফলে গাছ পানিশূন্য হয়ে নেতিয়ে পড়ে। লবণাক্ত জমিতে দ্রবীভূত লবণের মাত্রা বা পরিমাণ বেশি থাকায় গাছ মাটি থেকে খাদ্য উৎপাদন ও পানি কোনোটি সহজে শোষণ করতে পারে না। প্রতিকূলতার সৃষ্টি হয় শোষিত উপাদানগুলোর আত্তীকরণেও।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুল বাতেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত উষ্ণায়ন যত বাড়বে, ততই আমাদের দেশের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে। সেই সঙ্গে লবণাক্ত পানি আরও ছড়িয়ে পড়বে ফলে বিপদ আরও বাড়বে।’
জমির লবণাক্ততা রোধে প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট কারণ দুটো চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। লবণ পানির ব্যবহার কমাতে হবে। পোল্ডার ব্যবস্থাপনাসহ স্লুইসগেট ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে। লবণসহিষ্ণু বিভিন্ন জাতের ফসল উৎপাদন করতে হবে। সর্বোপরি মাটি ও পানির লবণাক্ততা রোধে সবাইকে সচেতন হতে হবে।