বাংলাদেশিদের বিনিয়োগের অন্যতম স্থান হয়ে উঠেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই। অনেকেই দেশ থেকে অবৈধ উপায়ে অর্থ নিয়ে সেখানে বিনিয়োগ করেছেন। তবে এর মধ্যে আবাসন খাতে বেশি বিনিয়োগ করেছেন তারা। তবে কারা এসব ফ্ল্যাট কিনেছেন তাদের নাম প্রকাশ করা না হলেও এখানে ফ্ল্যাট ও বাড়ি কিনেছেন সেলিব্রিটি থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, সাবেক ও বর্তমান চাকরিজীবী, খেলোয়াড়, সাংবাদিকসহ অনেকে। এমনকি সন্দেহভাজন অপরাধীরাও এ তালিকায় রয়েছেন। ইইউ ট্যাক্স অবজারভেটরির এক প্রতিবেদনে দুবাই শহরে যারা শতভাগ প্রস্তুত আবাসন সম্পদ কিনেছেন বা অপ্রস্তুত আবাসন সম্পদ কিনতে যাচ্ছেন যাদের গোমর ফাঁস হয়েছে। সম্পদের মালিক এমন বাংলাদেশির সংখ্যা ২০২২ সালে ছিল ৩৯৪। ওই বছর তারা মোট ২২ কোটি ৫৩ লাখ ডলারের সম্পদ কিনেছেন।
২০২৩ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৩২০-এ। অর্থাৎ এক বছরে বেড়েছে ১৩৮ জন; যা শতকরা হারে প্রায় ২৬ শতাংশ। তথ্য বলছে, শুধু দুবাই নয়, শারজাহ, আবুধাবিতে নামে-বেনামে আবাসন খাতে বিনিয়োগ করেছেন বাংলাদেশিরা। পাশাপাশি হোটেলসহ নানা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করেছেন। এসব বিনিয়োগে নিজেদের আড়াল করে রাখছেন অনেকেই। প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধু বাংলাদেশিই নয়, এসব এলাকায় বিভিন্ন দেশের ধনীদেরও সম্পদ রয়েছে। বিভিন্ন দেশি-বিদেশি প্রতিবেদনে অর্থ পাচার করেছে এমন অনেক বাংলাদেশির নাম এসেছে।
দুবাইয়ের অর্থ পাচারকারীদের তালিকা করেছে এনবিআর। এটি একটি ভালো উদ্যোগ। এনবিআর থেকে টাস্কফোর্স কমিটি চূড়ান্ত তদন্তকালে এসব পাচারকারীর পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করবে। পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ নিশ্চিত হলে তা দেশে ফেরত আনতে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে পাচার করা অর্থ থেকে হিসাব কষে রাজস্ব আদায় করা হবে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত এসব বাংলাদেশিকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়েছে বলে মনে হয় না। শাস্তি না পাওয়ায় অর্থ পাচারকারীরা থামছে না। অন্যরাও অর্থ পাচারে উৎসাহিত হচ্ছে।
ট্যাক্স অবজারভেটরির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে যে ৫৩২ জন বাংলাদেশি আবাসন কিনেছেন, তাদের কেনা সম্পদের অর্থের মূল্য ছিল ৩৭ কোটি ৭৪ লাখ ডলার। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিনিয়োগপ্রত্যাশী নীতির কারণে আবাসন খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। দেশটি আবাসন খাতে বিনিয়োগের জন্য অনেকটা দরজা খুলে বসে আছে। দুবাই শহরে বিনিয়োগ করার সক্ষমতা থাকলেই তিনি সেখানে বাড়ি কিনতে পারেন। এর বাইরে আর কিছু খোঁজে না আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ। সে কারণে দুবাই এখন সাধারণ বহুজাতিক নয় বরং তা বিদেশিদের শহর হয়ে গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩০ লক্ষাধিক মানুষের দুবাই শহরে আমিরাতিরা চূড়ান্ত সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছেন। এখন তারা মাত্র ৮ শতাংশ।
দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান সচিব গোলাম রহমান খবরের কাগজকে বলেন, উন্নত দেশে বসবাসের জন্য বাড়ি বা ফ্ল্যাট কেনা অপরাধ নয়। ভালো পরিবেশে সবাই বসবাস করতে চান। তবে তদন্ত করে দেখতে হবে যে, কর ফাঁকি দিয়ে বা অর্থ পাচার করে বাড়ি-ফ্ল্যাট কেনা হয়েছে কি না। বাংলাদেশিদের আর্থিক সক্ষমতা থাকলে দুবাই কেন, পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় তারা সম্পদ কিনতে পারেন। তবে আইন মেনে অর্থ পাঠাতে হবে। অর্থ পাচার কমাতে দেশের মধ্যে বিভিন্ন সুবিধা দিতে হবে। আবাসনসহ সব খাতে বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অর্থ পাচার করলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
সরকারের একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে এনবিআর কঠোরভাবে তদন্ত করলে পাচারকারীকে চিহ্নিত করা সম্ভব। দুবাইয়ে যারা ফ্ল্যাট-বাড়ি কিনেছেন তাদের তালিকা প্রকাশ করতে হবে। তারা আইন মেনে এসব বাড়ি বা ফ্ল্যাট কিনেছেন কি না, তা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে খতিয়ে দেখতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকও তদন্ত করতে পারে। রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে সরকারকে না জানিয়ে এ ধরনের অপরাধ করলে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধের শাস্তি না হওয়ায় দেশের অর্থ তারা প্রতিনিয়তই পাচার করতে উৎসাহিত হচ্ছে। এ ধরনের অপরাধপ্রবণতা কখনোই দেশের জন্য কল্যাণকর হবে না।