খুলনা অঞ্চলে শিল্পায়নের পথে এখন প্রধান অন্তরায় গ্যাস। শিল্পায়নের জন্য অবশ্যই গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে হবে। শিল্পনগরীখ্যাত খুলনা মহানগরী অনেকটাই শিল্পহীন। দুই দশকের বেশি সময় ধরে পরিত্যক্ত পড়ে আছে খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল, হার্ডবোর্ড মিল ও দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরি। লোকসানের কারণে এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি পাটকল। বেকার হয়েছেন ৫০ হাজারের বেশি শ্রমিক-কর্মচারী। শিল্পনগরী হিসেবে ঐতিহ্য ফেরাতে খুলনায় গ্যাসের ব্যবস্থা করা আশু প্রয়োজন। বিশ্লেষকরা বলছেন, পদ্মা সেতু চালুর পর খুলনায় শিল্পায়নের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ না থাকায় তা কাজে লাগানো যায়নি। জ্বালানিসংকটে পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়েছে বহু গুণ। ফলে লোকসানের আশঙ্কায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে রাজি হচ্ছেন না শিল্পোদ্যোক্তারা।
প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, ১৯৫৭ সালে খুলনার খালিশপুরে ভৈরব নদের তীরে যাত্রা শুরু হয়েছিল খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের। লোকসানের কারণে ২০০২ সালের ৩০ নভেম্বর কারখানাটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পাশে ১৯৬৫ সালে স্থাপিত খুলনা হার্ডবোর্ড মিলটি বন্ধ হয় ২০১৩ সালের ২৬ নভেম্বর। ১৯৫৫ সালের রূপসা এলাকায় স্থাপিত দাদা ম্যাচ কারখানা বন্ধ প্রায় এক যুগ ধরে। বন্ধ তিন কারখানার জমিতে নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেয় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। কাগজ কল, সার কারখানা ও অ্যাসিড কারখানা নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানানো হলেও তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। এর বাইরে লোকসানের কারণ দেখিয়ে ২০২০ সালের ২ জুলাই একই সঙ্গে খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি পাটকল বন্ধ করা হয়। এতে চাকরি হারান ৩৩ হাজার স্থায়ী-অস্থায়ী শ্রমিক। গত চার বছরে চারটি পাটকল ইজারা দেওয়া হলেও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়া যায়নি।
শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, প্রাকৃতিক ও ভূরাজনৈতিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে খুলনাকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি বাণিজ্যিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। খুলনায় শিল্পায়নের সব ধরনের সম্ভাবনা থাকলেও বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ হারাচ্ছেন শুধু গ্যাসের অভাবে। মূলত পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহের অভাবে শিল্প-কারখানা গড়ে উঠতে সময় নিচ্ছে। জানা যায়, ২০০৯ সালের মধ্যে সঞ্চালন লাইন স্থাপন প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা থাকলেও নানা জটিলতায় তা আটকে যায়। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে খুলনার আড়ংঘাটা থেকে ২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। এ জন্য সঞ্চালন লাইন, আড়ংঘাটায় ল্যান্ডিং স্টেশনসহ অন্যান্য স্থাপনার কাজও শেষ হয়। কিন্তু সরকারি সিদ্ধান্তের অভাবে শিল্প-কারখানায় গ্যাস সংযোগ এখনো দেওয়া যায়নি। এ নিয়ে খুলনায় পাইপলাইনে গ্যাসের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছে নাগরিক সংগঠন বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটি।
বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ খুলনার পরিচালক প্রণব কুমার রায় খবরের কাগজকে বলেন, ‘পদ্মা সেতু নির্মাণকালীন থেকেই খুলনা অঞ্চলে বিনিয়োগে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ দেখেছি। বিগত কয়েক বছরে বিনিয়োগের হার বেড়েছে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে পারলে এ অঞ্চলের অর্থনীতি বদলে যাবে।’
খুলনা অঞ্চলে শিল্পায়নের বাধা দূর করতে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে সরকারের উদ্যোগ নিতে হবে। জ্বালানিসংকটে একের পর এক শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে অনেক শিল্প বন্ধ হয়েছে, আবার কিছু বন্ধ হওয়ার উপক্রম। খুলনা অঞ্চলের পদ্মা সেতুর সুফল পেতে শিল্পোদ্যোক্তারা আগ্রহী হয়ে আছেন পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহের অপেক্ষায়। সরকার দ্রুত এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করলে অত্র এলাকার মানুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি শিল্পোন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।