সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যার পৈশাচিক ঘটনা মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। সমাজে এমন ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত শনিবার রাজধানীর বসুন্ধরা এলাকায় জাপানপ্রবাসীকে খুন করে কানাডায় পালিয়েছেন স্ত্রী। গত রবিবার ময়মনসিংহে সৌরভ নামে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর চার খণ্ডের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। মাদকের টাকা না পেয়ে মাকে হত্যা করেছে ছেলে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের এক তথ্যমতে, শুধু মে মাসেই নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২৪৩ নারী। হিজড়াদের পাশবিক নির্যাতনে চোখ হারিয়েছেন একজন পুলিশ সদস্য। বগুড়া পৌর এলাকায় বনানীর একটি হোটেল কক্ষে স্ত্রী ও শিশুপুত্রকে হত্যা করেছেন সেনাসদস্য। এসব ঘটনা সমাজ অধঃপতনের কিছু নমুনা। অপরাধের এমন পৈশাচিক ও বর্বর রূপ দেখে শিউরে উঠছে মানুষ। এমন কাণ্ড ভাবিয়ে তুলছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য কিংবা অপরাধ বিশেষজ্ঞদের।
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এসব বীভৎস ও পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের ঘটনা আলোড়ন সৃষ্টি করেছে সমাজের অন্দরমহলে। আমরা সমাজে নানাবিধ অপরাধ-অনিয়ম সহ্য করতে করতে এমন এক জায়গায় গিয়ে ঠেকেছি, এখন কোনো অপরাধ দেখলে তা আর অপরাধ মনে হয় না। আমাদের মানবিক মূল্যবোধের জায়গাটি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। যখন কোনো অপরাধ সংঘটিত হয় তখন দরকার বিচক্ষণতার সঙ্গে ওই অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করা। অর্থাৎ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু সমাজে আইনের শাসন দুর্বল হওয়ার সুযোগে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। অপরাধীকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসার দীর্ঘ পথপরিক্রমায় একসময় অপরাধী বিভিন্ন ছত্রচ্ছায়ায় পার পেয়ে যায়। এতে করে সমাজে লোমহর্ষক ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি দেখা যায়। বিচার না হওয়ার সংস্কৃতি ভয়ংকরভাবে সমাজে প্রভাব বিস্তার করছে।
নীতিবোধ ও চারিত্রিক মূল্যবোধ সমাজে ফিরিয়ে আনতে হবে যেকোনো মূল্যে। তরুণসমাজকে মানবিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত করার সময় এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণ ও অকল্যাণগুলো বুঝিয়ে দিতে হবে তাদের। হতাশা নয়, পরিশ্রম করেই সফলতা আনতে হবে। মেধাবীরা যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছে না। ফলে তারা নানা অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। বিনা পরিশ্রমে রাতারাতি ধনী হওয়ার স্বপ্নে, কেউবা ইউটিউবার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর হওয়ার স্বপ্নে নানা অপরাধে যুক্ত হচ্ছে। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগের উৎকর্ষ ঘটেছে ঠিকই কিন্তু এটাকে সহজলভ্য করে নিয়েছে যুবসমাজ। যার নেতিবাচক প্রভাবও পড়ছে সমাজে।
অল্প বয়সী ছেলেমেয়েরা পর্নোগ্রাফিতে যুক্ত হচ্ছে। এসব অপরাধ প্রতিরোধে প্রয়োজন সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতা। এ দায়িত্ব প্রথমত বর্তায় পরিবার ও সমাজের ওপর। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রেরও দায় রয়েছে। দেশে ধনবৈষম্য সৃষ্টি হওয়ায় মানুষের মধ্যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা বেড়েছে। যেকোনো মূল্যে ধনী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর অনেকে। এ জন্য ভয়ংকর অপরাধ করতেও দ্বিধা করছে না তারা। নৈরাজ্যের জালে আটকা রয়েছে মানবিক মূল্যবোধ। দেশপ্রেম, ধৈর্য, উদারতা, শৃঙ্খলা, পারস্পরিক মমত্ববোধ, সামাজিক মূল্যবোধসম্পন্ন গুণাবলি অবক্ষয়ের দ্বারপ্রান্তে। যা বর্তমান সমাজব্যবস্থায় মাকড়সার জালের মতো বিস্তৃত হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান শাহরিয়ার আফরিন খবরের কাগজকে বলেন, পৃথিবীতে এমন পৈশাচিক অপরাধ যে নতুন বা কখনো ঘটেনি সেটা নয়। আদি যুগেও এমন ঘটনা ঘটত। কিন্তু এই সভ্য সময়ে এ ধরনের বর্বরতা অবশ্যই ভাবিয়ে তুলছে। উন্নত বিশ্বে বা অধিকতর সভ্য দেশগুলোতে এ ধরনের ঘটনা কমে এসেছে। আমাদের এই অঞ্চলে ঘটনাগুলো নতুন হওয়ায় আমরা বেশি শিউরে উঠছি। এসব ঘটনার পেছনে অবশ্যই কিছু বিষয় কাজ করছে। এগুলো আমাদের পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অবক্ষয়ের পরিণতি।
মানুষে মানুষে বন্ধন হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষ ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। যেনতেনভাবে অর্থ ও বিত্তের মোহে পড়ে যেকোনো নৃশংসতা ঘটিয়ে ফেলছে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সম্মিলিতভাবে সামাজিক অপরাধ কমিয়ে আনতে পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিবার থেকেই নৈতিক শিক্ষার বুনিয়াদ তথা ভিত্তি তৈরি করে দেওয়া উচিত। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিশুদের নৈতিক শিক্ষার ওপর মনোযোগ দিতে হবে। পরিবারও এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় যুবসমাজকে নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষায় উজ্জীবিত করতে পারলে সমাজ থেকে এ ধরনের অপরাধ অনেকটাই কমে আসবে।