কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে সহিংসতা ও নাশকতায় অনেক প্রাণহানি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ ঘটনায় ছয় দিন দেশ প্রায় অচল ছিল। কারফিউ দিয়ে পরিস্থিতি অনুকূলে আনার চেষ্টা করে সরকার। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য সচল করা ইন্টারনেট না থাকায় বিঘ্নিত হচ্ছে।
এখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উন্মুক্ত করে দেওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়নি। এ অবস্থায় রাজধানীসহ দেশের কয়েকটি এলাকায় আবারও বিক্ষোভ হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কর্মসূচি ঘোষণার পর গত সোমবার রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করেছেন আন্দোলনকারীরা।
রাজধানীতে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৬ সমন্বয়ক গত রবিবার এক ভিডিও বার্তায় শিক্ষার্থীদের চলমান কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। এরপর অন্য সমন্বয়কদের মধ্যে কয়েকজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়ে আন্দোলন চলমান থাকবে বলে জানান।
সরকারি তথ্যমতে, কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে গত কয়েক দিনে সারা দেশে সহিংসতায় ১৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন শিক্ষার্থী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। নিহতদের স্মরণে গত মঙ্গলবার দেশব্যাপী এক দিনের শোক পালন করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সরকার আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ সম্পর্কে অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। সেই সঙ্গে সব ধরনের অপপ্রচার রুখতে সংশ্লিষ্টদের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বলেছেন তিনি।
সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনের শান্তিপূর্ণ ও যৌক্তিক একটা সমাধান জাতি পাবে, এমনটাই আশা করেছিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ দেশের সবকিছু স্বাভাবিক একটা গতি পাবে। কিন্তু পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। দেশের সংকট পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিশিষ্ট নাগরিকরা বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছেন। শান্তি ও স্বস্তি ফেরানোর পথ নিয়ে বিভিন্ন অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষার্থীরা সংগত আন্দোলনে নেমেছিলেন। তারা কোটা বাতিল চাননি, কোটার সংস্কার চেয়েছেন। কিন্তু শুরুতে একটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীকালে অনেক পানি ঘোলা হয়। সহিংসতা এবং নানা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়ে দেশ এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়।
শিক্ষাব্যবস্থায় দ্রুত শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা দরকার। এটি করতে ব্যর্থ হলে শিক্ষার ভিত নড়বড়ে হয়ে যাবে। তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আইনের শাসন বা রাজনীতির ধারাসহ সবকিছুর প্রতি অনাস্থা চলে আসবে।
শিক্ষার্থীদের রাজনীতির প্রতি আস্থা না থাকলে বিপদে পড়তে হবে। তাদের মনের মধ্যে দাগ কেটে থাকবে। এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। কোটা একটি উছিলা মাত্র। মূলত আমাদের দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়ে গেছে। তাদের জন্য আগামীতে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।
সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, সরকার উদ্যোগ নিলে বর্তমান পরিস্থিতির উত্তরণের বিষয়ে আশ্বস্ত হওয়া যায়। বিষয়টা অনেক দিন টেনেহিচঁড়ে নেওয়ার কোনো অবকাশ আছে বলে মনে করি না। সরকারের সেই সামর্থ্য থাকা উচিত। কাজেই সরকার কী করে তার জন্য আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে।
সরকারকেই দায়দায়িত্ব নিয়ে এ পরিস্থিতির নিষ্পত্তি করতে হবে। এই পরিস্থিতির আর যেন কোনোভাবে অবনতি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সে জন্য সরকারকে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে সংকট মোকাবিলা করতে হবে। কিছু ছাড় দিয়ে হলেও পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে হবে।
সংকট নিরসনে অন্যান্য রাজনৈতিক দল যারা দেশপ্রেমিক, যারা দেশের শান্তি চায়, তাদের সঙ্গে বসে একটা ঐকমত্যে আসা যেতে পারে। দেশের স্বার্থে, জননিরাপত্তার স্বার্থে, দেশের উন্নয়নের স্বার্থে সবাইকে একমত হতে হবে। যারা অরাজকতা করছে, সন্ত্রাস করছে, হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, সেগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে আইনের আলোকে ব্যবস্থা নিলে পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটতে পারে।
অর্থনৈতিক ক্ষতি যেটা হয়েছে, সেটার ব্যাপকতাও অনেক। এতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। রাষ্ট্রীয় অফিস, স্থাপনা ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ জন্য সব ক্ষেত্রেই দরকার দেশের শান্তিশৃঙ্খলা ও স্বস্তি ফিরিয়ে নিয়ে আসা। একটা সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরির উপায় বের করতে হবে। সরকার ইতোমধ্যে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিল।
তেমনি সমাজে বিভিন্ন অংশীজনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংকট উত্তরণ নিয়ে আলোচনায় বসতে পারে। মানুষের কাছে বিশ্বাসের জায়গা সৃষ্টি এবং জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে হলে আলোচনার বিকল্প নেই। দেশের সংকট উত্তরণে সরকারকে আরও কৌশলী ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশেষ করে বিশেষজ্ঞদের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি উত্তরণে কাজ করতে হবে।