বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে অন্যান্য দলের সঙ্গে জামায়াতকেও রাজনীতি করার সুযোগ দেন। দেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল জামায়াত। তারা রাজাকার, আলশামস, আলবদর ও শান্তি কমিটি গঠন করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হত্যাসহ সারা দেশের সম্পদ লুণ্ঠন এবং ধ্বংসযজ্ঞের সহযোগী ছিল জামায়াত। তারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি জড়িত থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া, নারী ধর্ষণ, গণহত্যা এবং নানা নারকীয় ঘটনা ঘটায়। দেশের স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরও তাদের কৃতকর্মের জন্য তারা দেশের জনগণের কাছে ক্ষমা চায়নি। যদিও বিএনপি নেতৃত্বাধীন খালেদা জিয়া সরকারের আমলে জামায়াতের দুজন নেতা মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে শপথ নেন। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব স্বীকার না করেও তারা তাদের গাড়িতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছেন। এটা করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে তারা একধরনের প্রতারণা করেছেন। এখনো তারা স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকারই করেন না। সেই দলটি কখনো আওয়ামী লীগ, কখনো বিএনপির ছত্রচ্ছায়ায় এ দেশে রাজনীতি করার সুযোগ পেয়েছে। এটা ছিল বাঙালি জাতির জন্য খুবই লজ্জাজনক ও বেদনাদায়ক।
১৯৭৯ সালের ২৫ মে থেকে বাংলাদেশে প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুযোগ পায় জামায়াত। ইসলামী ছাত্র সংঘের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ইসলামী ছাত্রশিবির। এ ছাড়া শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর অস্তিত্ব একাত্তরে দেশ স্বাধীনের সময়েই বিলুপ্ত হয়ে যায়। তবে সেই রাজাকারদের ভুলে যায়নি এ দেশের মানুষ। দেশের জনগণের দাবি এবং অব্যাহত চাপের মুখে শেখ হাসিনা সরকার জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের শাস্তির মুখোমুখি করে। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য জামায়াতের তৎকালীন আমির গোলাম আযমের সাজা হয়। কিন্তু সাজাভোগের মধ্যেই তিনি মারা যান। তবে মতিউর রহমান নিজামী, মোহাম্মদ কামরুজ্জামান, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও আবদুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড হয়। পরে আরও বেশ কয়েকজন নেতার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ফাঁসির দণ্ড দেওয়ার সময় আদালত বলেছিলেন, সংগঠন হিসেবে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায় জামায়াত এড়াতে পারে না। জামায়াতের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
রায়ের আলোকে ২০০৮ সালে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন দেওয়ার সময় নির্বাচন কমিশনে (ইসি) জামায়াতও আবেদন করে। কিন্তু সংবিধান এবং জামায়াতের দলীয় গঠনতন্ত্র পরস্পরবিরোধী বলে ইসি নিবন্ধন দেওয়া থেকে বিরত থাকে। এবারও সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করেনি।
গত মাসে দেশে সংঘটিত সহিংসতা ও নাশকতার অভিযোগে জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ও দলটির অঙ্গসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির নিষিদ্ধ করা হয়েছে সাতটি কারণে। যদিও রাজনৈতিক দল হিসেবে অনেক আগে নির্বাচন কমিশনে দলটির নিবন্ধন বাতিল হয়েছে। এখন তারা সাংগঠনিক সব কর্মকাণ্ড করার সুযোগ হারাল। সম্প্রতি কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে অরাজকতা সৃষ্টি, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সার্বভৌমত্ব নস্যাতের ষড়যন্ত্র- এ ধরনের অপরাধে উসকানি ও সহযোগিতা, ’৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধসহ ৭ ধরনের অভিযোগে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করার পক্ষে মতামত দেওয়া হয়। বিষয়টি অধিকতর যাচাই শেষে গত বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, কোনো দলকে যখন নিষিদ্ধ করা হয়, তখন সেটি নির্বাহী আদেশেই হয়। গত সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনে অনুষ্ঠিত ১৪ দলের বৈঠকে জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্তের পর জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মতামত পাঠায় আইন মন্ত্রণালয়। জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ হলেও আপাতত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। পাশাপাশি দলটি আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ ছাড়া বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো জামায়াত নিষিদ্ধের প্রতিবাদ জানায়। আমরা আশা করি, জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশে সহিংসতা ও নাশকতার রাজনীতির অবসান ঘটবে। দেশে চলমান অস্থির রাজনীতিতে শান্তি ফিরে আসবে। সরকার নিশ্চয়ই শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় সব ধরনের পদক্ষেপ নেবে, সেটাই প্রত্যাশা।