কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী সহিংসতার ঘটনায় সন্তানদের নিয়ে অভিভাবকদের উৎকণ্ঠা বাড়ছে। বাচ্চাদের লেখাপড়া নিয়েও অনেক অভিভাবক উদ্বিগ্ন। করোনাকালীন শিক্ষাব্যবস্থায় এসেছিল বড় ধাক্কা। সেই ধাক্কা সামলে উঠতে না উঠতেই কোটা সংস্কার আন্দোলন নতুন করে শিক্ষাক্ষেত্রে ক্ষত তৈরি করেছে।
এতে শিক্ষাব্যবস্থায় একধরনের অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা ভর করেছে। বেশ কিছুদিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার মতো পরিবেশ এখনো হয়ে ওঠেনি। এরই মধ্যে সরকার ১২টি সিটি করপোরেশন ও নরসিংদী সদর ছাড়া সব প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, কিন্তু বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নতুন করে কর্মসূচি দেওয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে। অভিভাবকরা বলছেন, সাম্প্রতিক সহিংসতায় নিহতদের মধ্যে অন্তত এক ডজন শিশু রয়েছে। এসব শিশু বারান্দায়, ছাদে অথবা বাইরে বের হওয়ার কারণে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। অনেক অভিভাবক এই মুহূর্তে বাচ্চাকে বাইরে নেওয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন।
তারা বলছেন, অদৃশ্য স্থান থেকে গুলি এসে শরীর ভেদ করার বেশ কয়েকটি ঘটনার খবর এসেছে। এ ছাড়া অনেক কিশোর নিহত হয়েছে এবং অনেকে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে। পুলিশের ব্লক রেডের নামে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তল্লাশির ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এ কারণে কোনো অভিভাবকই তাদের সন্তানদের ঘর থেকে বের হতে দিচ্ছেন না।
সম্প্রতি কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় সংঘটিত সহিংসতায় সরকারি হিসাবে ১৫০ জন নিহত হয়েছেন। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা আরও বেশি বলা হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত ১০৩ জনের বয়স খুবই কম। তাদের পরিবারের দাবি অনুযায়ী কেউই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। অদৃশ্য স্থান থেকে গুলি এসে তাদের গায়ে লেগেছে।
এ ছাড়া সহিংসতায় আহত হয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। এখন এসব খুনের বিচার দাবি করে আন্দোলন করছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্র-জনতা। এর ওপর আবার জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধ করার কারণে নতুন আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন অভিভাবকরা।
চলমান পরিস্থিতিতে অভিভাবকরা কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছেন না। প্রতিদিনই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার ভয়ে উদ্বিগ্ন থাকতে হচ্ছে। কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী বাড়িতে অবস্থান করছেন। প্রতিটি জেলায়ও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক আরও ছড়িয়ে পড়েছে। এইচএসসি পরীক্ষা চলমান ছিল। এখনো বেশ কিছু বিষয়ের পরীক্ষা বাকি। চলমান সংকটে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরাও গ্রেপ্তার হয়েছে। এরই মধ্যে ৭৮ জনকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। আরও কেউ জেলে থাকে তা হলে তাদের অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া হোক। তাদের বিরুদ্ধে মামলা নিঃশর্তে প্রত্যাহার করতে হবে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে অবিলম্বে পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত জরুরি ভিত্তিতে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আলোচনায় বসা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার বিষয়ে তাদের মতামত ও পরামর্শ নিয়ে পদক্ষেপ নেওয়া। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বৈঠক করা। অনেকেই বলছেন, সর্বদলীয় বৈঠক করে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে হবে। দেশের অভিভাবক হিসেবে প্রধানমন্ত্রী অতিদ্রুত এই উদ্যোগ নিতে পারেন। তা হলে হয়তো শেষরক্ষা হবে।