নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গতকাল বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় বঙ্গভবনে শপথ গ্রহণ করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলী। এর মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসসহ উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্যদের উষ্ণ অভিনন্দন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদ্যমান সংবিধানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কোনো রূপরেখা নেই। মেয়াদের ব্যাপারটাও চূড়ান্ত হয়নি। তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠক করে এ সরকারের মেয়াদ কমপক্ষে তিন বছর করার বিষয়ে মত দিয়েছেন।
সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত বুধবার দুপুরে ইউনূস সেন্টার থেকে দেশবাসীর উদ্দেশে একটি বার্তা গণমাধ্যমকে পাঠিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি সাহসী ছাত্রদের অভিনন্দন জানাই, যারা আমাদের দ্বিতীয় বিজয় দিবসকে বাস্তবে রূপ দিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
অভিনন্দন জানাই দেশের আপামর জনসাধারণকে, যারা ছাত্রদের এই আন্দোলনে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছেন। কোনো প্রকার ভুলের কারণে আমাদের এই বিজয় যেন হাতছাড়া হয়ে না যায়। আমি সবাইকে বর্তমান পরিস্থিতিতে শান্ত থাকতে, সব ধরনের সহিংসতা এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বিনষ্ট করা থেকে বিরত থাকতে আহ্বান জানাচ্ছি।’ ফ্রান্সের প্যারিস থেকে ফিরে বিমানবন্দরে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের ত্যাগে অর্জিত স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে।
সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, গণডাকাতি ও লুটপাট এখনো চলছে। পুলিশ সদস্যরা জীবন হারানোর ভয়ে টানা তিন দিন কোনো দায়িত্ব পালন করেননি। ৭ আগস্ট নতুন আইজিপি হিসেবে মো. ময়নুল ইসলাম দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তিনি ওই দিনই পুলিশ সদস্যদের অনুরোধ জানিয়ে বলেন, প্রত্যেক পুলিশ সদস্যকে যার যার কর্মস্থলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ফিরতে হবে এবং কাজে মনোযোগ দিতে হবে। বৃহস্পতিবারই পুলিশ সদস্যরা যোগ দিয়েছেন বলে জানা যায়।
রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যাতে ঠিক থাকে, সে জন্য দ্রুত সময়ের মধ্যে থানাগুলোকে সক্রিয় করতে হবে। তা না হলে এ ধরনের ঘটনা আরও বাড়বে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাহারা না থাকায় অরক্ষিত হয়ে পড়েছে দূতাবাস এলাকা। এ কারণে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন ঢাকায় থাকা কূটনীতিকরা। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর প্রশাসন আইন ও শিক্ষাক্ষেত্রে উচ্চপদস্থ অনেকে পদত্যাগ করেছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ পদেও রদবদল চলছে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগও বাতিল করা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, নতুন সরকারের প্রথম কাজ হবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ফিরিয়ে মানুষের মধ্যে স্বস্তি আনা। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কাজগুলোর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে দেশে একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করবে। বিচারব্যবস্থা, জনপ্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীকে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। দেশ সংস্কার করার সময় এসেছে। দেশের ছাত্র-জনতা এই সংস্কার আন্দোলনের পটভূমিতে তা দেখিয়ে দিয়েছেন। বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে সাম্য ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশে ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে সৎ ও দক্ষ কর্মী নিয়োগ দিয়ে একটি কার্যকর ও গতিশীল প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে হবে।
এ জন্য সবার আগে দরকার আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় গুণগত পরিবর্তন আনতে পদক্ষেপ নিতে হবে। স্বচ্ছতার ভিত্তিতে প্রতিটি সেক্টরে জন-অংশগ্রহণ বাড়িয়ে এই সংস্কারকাজগুলো করতে হবে। গণতান্ত্রিক রূপান্তরের কাজটি করতে হলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে দেশের সব দলের অংশীজনের মতামত নিয়ে কাজটি করলে সংস্কারকাজ সহজ হবে। আপামর জনগণ দেশের ইতিবাচক পরিবর্তন দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে প্রত্যাশা অনেক। অন্তর্বর্তী সরকারের সব কার্যক্রম সফল হোক।