নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে গত বৃহস্পতিবার রাতে শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে। গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর দেশ কার্যত সরকারবিহীন ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের শপথের মধ্য দিয়ে সেই শূন্যতা পূরণ হলো।
বৃহস্পতিবার রাতে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেওয়ার পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘অরাজকতার বিষবাষ্প যারা ছড়াবে, তাদের কঠোর হাতে দমন করা হবে।’ সরকার পতনের পর রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। দেশের বিভিন্ন স্থানে থানা ও ফাঁড়িগুলোতে হামলা করে বিক্ষুব্ধ জনতা। বেশ কয়েকজন পুলিশকে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে মারা হয়। আতঙ্কগ্রস্ত পুলিশ থানা ছেড়ে পারিয়ে যায়। সেই থেকে থানাগুলোতে ঝুলছে তালা।
এ সুযোগে দুষ্কৃতকারীরা রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে গণডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটায়। অনেকেই থানা-পুলিশের নম্বরে ফোন দিয়ে সহযোগিতা চেয়েও সাড়া পাননি। এতে সাধারণ জনগণের মধ্যে হতাশা নেমে এসেছে। খবরের কাগজের তথ্যমতে, রাজধানীর ১০টি এলাকায় গণডাকাতি ও ছিনতাই, রাহাজানির ঘটনা ঘটেছে। এসব এলাকায় দুষ্কৃতকারীরা রাতের ফাঁকা সড়কে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে যার কাছে যা পাচ্ছে তা কেড়ে নিচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ দেশের চলমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে শিল্পের জন্য অনিরাপদ আখ্যায়িত করে অবিলম্বে শিল্প এলাকাসহ সারা দেশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার দাবি জানিয়েছেন। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে বিদেশে ক্রেতাদের কাছে ভুল বার্তা যাবে বলে আশঙ্কা রয়েছে। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, হয়রানিমুক্ত পরিবেশ ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন করে রপ্তানি বাণিজ্য বাড়াতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করবে নতুন অন্তর্বর্তী সরকার।
নতুন দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। ছাত্র-জনতার চাওয়াকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। প্রত্যেক মানুষকে হৃদয় দিয়ে দেশ সংস্কারে এগিয়ে আসতে হবে। এ জন্য দরকার যথাযথ পরিকল্পনা এবং সে অনুযায়ী বাস্তবায়ন। দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
দল-মতনির্বিশেষে সাধারণ জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আস্থা রেখে দেশের জন্য কাজ করতে হবে। দেশের অর্থনীতি বর্তমানে খুবই নাজুক অবস্থায় রয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে যেসব সিন্ডিকেট রয়েছে, তাদের খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নির্দলীয় লোক নিয়োগ দিতে হবে।
রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গুণগত পরিবর্তন আনতে পদক্ষেপ নিতে হবে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে প্রতিটি সেক্টরে জন-অংশগ্রহণ বাড়িয়ে দেশ সংস্কারের কাজগুলো করতে হবে। গণতান্ত্রিক রূপান্তরের কাজটি করতে হলে অন্তর্বর্তী সরকারকে দেশের সব দলের অংশীজনের মতামত নিয়ে কাজটি করলে সংস্কারকাজ সহজ হবে। বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে সাম্য ও নায্যতার ভিত্তিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের উপযুক্ত পরিবেশ ফিরে না আসা পর্যন্ত এই সংস্কারকাজ চালিয়ে যেতে হবে। দেশের আপামর জনসাধারণ একটি ইতিবাচক সংস্কারের প্রত্যাশায় রয়েছে।
আমরা আশা রাখি, সাধারণ মানুষ দুবেলা পেট ভরে খেতে পাবে, গণতান্ত্রিক ধারায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ফিরে পাবে, জানমালের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা খুঁজে পাবে। প্রত্যাশা করছি, দেশে অচিরেই নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জনগণের সেই স্বপ্ন পূরণে সক্ষম হবে।