খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে বাংলাদেশ গত দুই বছর লাল শ্রেণিতে আছে। এক বছরের খাদ্য মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বিবেচনা করে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে এ তালিকায় রেখেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের খাদ্যনিরাপত্তার হালনাগাদ পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রতি ছয় মাস পরপর খাদ্যনিরাপত্তাবিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিশ্বব্যাংক। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কোন দেশে কত বেশি, তা বোঝাতে বিভিন্ন দেশকে চার শ্রেণিতে ভাগ করেছে বিশ্বব্যাংক।
যেসব দেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৩০ শতাংশ বা তার বেশি সেসব দেশকে ‘বেগুনি’ শ্রেণিতে, ৫ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে যেসব দেশের খাদ্যমূল্য স্ফীতি তাদের ‘লাল’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ২ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে মূল্যস্ফীতি দেশগুলোকে ‘হলুদ’ রাখা হয়েছে। ২ শতাংশের কম মূল্যস্ফীতির দেশগুলোকে ‘সবুজ’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে ১৭২টি দেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে সংস্থাটির প্রতিবেদনে।
দেশে বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেশ চড়া। সেই সঙ্গে চিকিৎসা, পরিবহনসহ খাদ্যবহির্ভূত খাতেও খরচ বেড়েছে। সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতির এ চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে মানুষকে। সরকার পতনের পর এ সমস্যা কাটিয়ে উঠতে বেশ কিছুদিন সময় লাগবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ছয় মাস আগেও বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে লাল শ্রেণিতে কয়েকটি উন্নত দেশও ছিল।
নানামুখী কৌশল ও পদক্ষেপের কারণে এসব দেশ উচ্চ খাদ্যমূল্য পরিস্থিতি সামাল দিয়ে লাল শ্রেণি থেকে বের হতে সক্ষম হয়েছে। দুই বছর ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি অনেক বেশি। বিশেষ করে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় থেকে যানবাহন ও পণ্য সরবরাহে সংকটের কারণে পণ্যসামগ্রী রাজধানীতে প্রবেশ করতে না পারায় সংকট বেড়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে সংকট উত্তরণে কাজ শুরু করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশের মানুষকে খাবার কিনতে গড় আয়ের অর্ধেকের মতো খরচ করতে হচ্ছে। নিম্ন আয়ের মানুষের খাবারের পেছনে ব্যয় আরও বেশি। দরিদ্র মানুষ তাদের আয়ের প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ খরচ করে খাবার কেনার পেছনে। এ অবস্থায় যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে সামনের দিনগুলোতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভয়াবহ করোনার থাবা, ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ- এসবই দেশের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দিয়ে গেছে। এ ধাক্কা সামলানো এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। এরপর দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংকট খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। বিবিএস-এর জরিপ অনুযায়ী মাঝারি বা তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে দেশের প্রায় ২২ শতাংশ মানুষ।
সম্প্রতি সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ‘বাংলাদেশ অর্থনীতি ২০২৩-২৪: তৃতীয় অন্তর্বর্তীকালীন পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ২০১৯ সাল থেকে খাদ্যমূল্য বিবেচনা করলে বর্তমানে দেশে মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিক। শ্রমজীবীদের আয় কম, কিন্তু খাবারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করতে হয়।
বর্তমানে মাথাপিছু অভ্যন্তরীণ আয় ২৬৭৫ মার্কিন ডলার, আর মাথাপিছু জাতীয় আয় ২৭৮৪ ডলার। মাথাপিছু গড় আয় যতটুকু পেয়েছি, মূলত যারা উচ্চ আয় করেন তাদের কারণে। গরিব মানুষের কথা বিবেচনা করলে তাদের আয় কমে গেছে। এখানে বৈষম্য বেড়েছে। গত সোমবার বিবিএস জুলাই মাসের মূল্যস্ফীতির হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে। বিবিএসের তথ্যমতে, গত জুলাই মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ায় ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। গত জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ।
অন্যদিকে খাদ্য মূল্যস্ফীতি জুলাই মাসে বেড়ে ১৪ শতাংশ ছাড়াল। যা গত ১৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মূল্যস্ফীতির এই হিসাবেও ঘটেছে পরিবর্তন। অর্থনীতিবিদরা অনেক দিন ধরে বলে আসছিলেন সরকারি পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতির যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, বাস্তবে তার থেকেও বেশি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনের কারণে মূল্যস্ফীতি জুলাই থেকে দুই অঙ্কের ঘর ছাড়িয়ে গেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই এখন অন্তর্বর্তী সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা ও সামষ্টিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হলে অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ ও মতামত কাজে লাগাতে হবে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে অন্তর্বর্তী সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে কমিয়ে এনে দেশের অর্থনৈতিক সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে, এটাই প্রত্যাশা।