ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশির ভাগ জনপ্রতিনিধি কর্মস্থলে আসছেন না। স্থানীয় সরকারের সব স্তরেই আওয়ামী লীগ তাদের কর্তৃত্ব রেখেছিল। জেলা ও উপজেলা পরিষদ থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার বেশির ভাগ পদ দলীয় নেতা-কর্মীদের দখলে ছিল। গত ৫ আগস্টের পর থেকে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
অধিকাংশ সিটি করপোরেশনের মেয়র কর্মস্থলে আসছেন না। কেউ কেউ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। অনেকেরই খোঁজ মিলছে না। জীবন বাঁচাতে অধিকাংশ জনপ্রতিনিধি রয়েছেন আত্মগোপনে। তাদের অনুপস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম প্রধান নির্বাহী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী প্রকৌশলীরা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা জনপ্রতিনিধিদের হাতে থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
এসব প্রতিষ্ঠানে কাজের গতি আনতে সেখানকার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে (সিইও) আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে যেসব জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভার মেয়র নেই, সেখানেও সিইওকে আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা দিতে যাচ্ছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।
তথ্যমতে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে ১২৯ কাউন্সিলরের মধ্যে আত্মগোপনে আছেন ১১৮ জন। দেশের ৬৪টি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের মধ্যে ৪৪টি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানই বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন। ৪৯৫ উপজেলা পরিষদের ৩১৯টিতেই চেয়ারম্যান আত্মগোপনে আছেন। আর ৩৩০টির মধ্যে ২০৫টি পৌরসভার মেয়র আত্মগোপনে আছেন। এ ছাড়া অনেক জনপ্রতিনিধি নিজ এলাকায় থাকলেও কার্যালয়ে যাচ্ছেন না। দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে ৯টির মেয়র আত্মগোপনে রয়েছেন।
২০১৫ সালের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় হতো। ২০১৫ সালের আইন সংশোধন করে আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো এই সিদ্ধান্তকে মেনে না নিয়ে নির্বাচন বর্জন করে। এর ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা অনেক স্থানে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
এতে দলের একচেটিয়া আধিপত্য স্থাপিত হয়। গত ৫ আগস্টের পর এসব প্রতিনিধি আত্মগোপনে থাকায় গুরুত্বপূর্ণ কাজে একধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। জন্ম ও মৃত্যুসনদের কার্যক্রম স্থবির হয়ে গেছে। এ কারণে সেবাগ্রহীতারা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। এ ছাড়া অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজও ব্যাহত হচ্ছে।
এসব জনপ্রতিনিধি সম্পর্কে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দলীয় মনোনয়ন যারা পেয়েছিলেন, তাদের অধিকাংশই সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্বে আসেননি। মনোনয়ন-বাণিজ্য, পেশিশক্তি, কালোটাকা ও প্রশাসনিক সহায়তায় তারা নির্বাচনে জয়লাভ করেছিলেন। তাই জনরোষের ভয়ে এখন পালিয়ে আছেন। তারা ফিরে না এলে অন্তর্বর্তী সরকারকে সাময়িক কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে।
স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে অন্তর্বর্তী সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে কিছু অধ্যাদেশ পরিবর্তন করে স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে হবে। অচল হয়ে পড়া স্থানীয় সরকারের কার্যক্রম দ্রুত সচল করে সেবাগ্রহীতাদের প্রত্যাশা পূরণে অন্তর্বর্তী সরকার যথার্থ ভূমিকা পালন করবে, সেটাই কামনা।