প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই আগামী বাজেটে শিক্ষা খাতে গুরুত্ব বাড়াতে নির্দেশ দিয়েছেন। এ জন্য বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হয়েছে। এমনকি শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকেও সুপারিশ নেওয়া হয়েছে। সবকিছু বিবেচনায় রেখে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে কিছু প্রস্তাব প্রণয়ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষা খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় একগুচ্ছ পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবে শিক্ষা-উপকরণের দাম কমাতে উৎপাদন ও আমদানিতে সব ধরনের রাজস্ব মওকুফ সুবিধা বহাল রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এসব প্রস্তাব খতিয়ে দেখে অনুমোদন দেওয়ার পর চূড়ান্ত বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এ ক্ষেত্রে উপদেষ্টা পরিষদ প্রস্তাব বাতিল বা সংশোধন করতে পারে। আবার সম্পূর্ণ নতুন প্রস্তাবও যোগ করতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের শিক্ষা বাজেটবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) অনুপাতে বাজেটে শিক্ষা খাতে মোট বরাদ্দ ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় কমানো হয়েছে। বাজেটে শিক্ষা খাতে মোট বরাদ্দ জিডিপির তুলনায় ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, আগামী বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হবে। শুধু তা-ই নয়, শিক্ষা খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায়ও জোর দেওয়া হবে।
যুগোপযোগী শিক্ষা নিশ্চিত করতে এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য গবেষণায় পর্যাপ্ত তহবিল বরাদ্দ বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। সবার জন্য কর্মোপযোগী শিক্ষা প্রসারের মাধ্যমে যুবকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বহুদিন ধরে বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের পক্ষ থেকে শিক্ষায় বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানানো হচ্ছে। শিক্ষাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে একশ্রেণির অসাধু ব্যক্তি বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের শিক্ষা বাজেটবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রাথমিক পর্যায় থেকে পদক্ষেপ নিতে হবে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নতুন বছরের শুরুতে বেতন বাড়ানো হয়, যা খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বাড়াতে প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রাখছে।
খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেতন বাড়ানোয় কড়াকড়ি আনতে হবে। মানহীন কোচিং সেন্টারের কারণে শিক্ষা খাতে সুশাসন নষ্ট হচ্ছে। এসব বন্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। শিক্ষা-উপকরণের দাম বাড়ার কারণে ও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। আবার সিন্ডিকেট করে এসব পণ্যের দাম বাড়ানোয় শিক্ষা খাতে সুশাসন নষ্ট হচ্ছে। শিক্ষা-উপকরণ উৎপাদন এবং আমদানিতে রাজস্ব আদায়ে ছাড় দিতে হবে। অতি প্রয়োজনীয় শিক্ষা-উপকরণের রাজস্ব মওকুফ সুবিধা আগামী দুই অর্থবছরের জন্য বহাল রাখতে হবে। একই সঙ্গে বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণ করতে নজরদারি বাড়াতে আগামী বাজেটে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, আমাদের দেশের বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়ের বেশির ভাগই খরচ হয় অবকাঠামোতে আর পরিচালন ব্যয়ের বেশির ভাগ খরচ হয় বেতন-ভাতা বাবদ। বিগত সময়ে শিক্ষা খাতে গুরুত্ব কম ছিল। শিক্ষা খাতের জন্য যেসব প্রস্তাব বাজেটে রাখা হয়েছিল তা গতানুগতিক। গুণগত শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের জন্য যা যথেষ্ট নয়। তাই আগামী বাজেটে এসব বিষয়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে।
শিক্ষায় গুণগত মান বজায় রাখার জন্য এ খাতে সুশাসন জোরদার করা জরুরি। উন্নত দেশের তুলনায় আমাদের দেশের শিক্ষাবিষয়ক গবেষণা, পড়ালেখার মান অনেক পিছিয়ে। বিগত সরকারের সময়ে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা সফলতার আলো দেখেনি। শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে, তা না হলে কোনো পরিকল্পনাই সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হবে না। অন্তর্বর্তী সরকার শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে টেকসই ও আধুনিকায়ন করতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে, সেটিই প্রত্যাশা।