ভিটামিন ‘ডি’র অভাবে শিশু, অন্তঃসত্ত্বা মা ও বয়স্করা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। গবেষকরা বলছেন, ভিটামিন ‘ডি’র অভাবে শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা হ্রাস পায়। দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ে। এই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে কার্ডিওভাসকুলার রোগ (হৃদরোগ ও রক্তসংবহনতন্ত্রের রোগ), ডায়াবেটিস, দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগ এবং কিছু ক্যানসার, যেমন- স্তন, কোলন ও প্রোস্টেটের ক্যানসার। বলা বাহুল্য, এর সবই মারাত্মক রোগ। সত্যিকার অর্থেই জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভিটামিন ‘ডি’র অভাবে রিকেটস রোগ হতে পারে। এই রোগে শিশুদের হাড় দুর্বল হয়ে যায় বা বেঁকে যায়। গর্ভাবস্থায় মাতৃত্বজনিত জটিলতা দেখা দেয়। প্রি-এক্লাম্পসিয়া, গ্লুকোজ সহনশীলতা কমে যাওয়া বা গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, সিজারিয়ান সেকশনের হার বৃদ্ধি এবং নবজাতকের জটিলতা যেমন- কম ওজন নিয়ে জন্ম, হাইপোক্যালসেমিয়াজনিত খিঁচুনি এবং হাড়, ফুসফুসের বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো ঝুঁকি ভিটামিন ‘ডি’র অভাবেই হতে পারে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এর অভাবে হাড় দুর্বল বা ক্ষয়ে যাওয়া, ফ্র্যাকচার বা হাড় ভেঙে যাওয়া, পেশির দুর্বলতা এবং শরীরে ব্যথা হতে পারে।
ভিটামিন ‘ডি’র উৎস দুটি। সূর্যের আলো ও খাবার। ব্র্যাকের একজন গবেষক বলেছেন, দেশের বেশির ভাগ মানুষ রোদে যান না; বিশেষ করে শহরের মানুষের খোলা আকাশের নিচে কোনো কাজ করার অবকাশ থাকে না। এ দেশের অধিকাংশ মানুষ ছায়ায় থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ভিটামিন ‘ডি’-যুক্ত খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের মানুষ সচেতন নয়। ডিম, দুধ, সামুদ্রিক মাছ ভিটামিন ‘ডি’র উৎস। এই তিনটি খাবার সুষম ও নিয়মিতভাবে অনেকের খাবারের মেনুতে থাকে না। এসব খাবারের অভাবেই মূলত মানুষের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে আর বিভিন্ন রোগে তারা আক্রান্ত হচ্ছেন।
জাতীয় পুষ্টি পরিষেবা ও আইসিডিডিআরবির যৌথভাবে পরিচালিত জরিপেও এই চিত্র উঠে এসেছে। জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, দেশে ৫ বছরের কম বয়সী ২২ শতাংশ শিশুর ভিটামিন ‘ডি’র ঘাটতি ছিল এবং ৭ শতাংশের মধ্যে মাঝারি ভিটামিন ‘এ’র ঘাটতি ছিল। অন্তঃসত্ত্বা নন এবং স্তন্যদান করেন না এমন ৭০ শতাংশ নারীর ভিটামিন ‘ডি’র অভাব ছিল, ২০ শতাংশ নারীর ভিটামিন বি১২ এবং ৭ শতাংশের হালকা ভিটামিন ‘এ’র ঘাটতি শনাক্ত করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের এই ভিটামিন ‘ডি’র অভাবজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে হবে। সে জন্য যা জরুরি সেটা হচ্ছে, মানুষকে পর্যাপ্ত সময় পর্যন্ত রোদে কাটাতে হবে অথবা খাবারের সঙ্গে ভিটামিন ‘ডি’ যুক্ত করতে হবে। ডিম-দুধ যেহেতু সবার খাবার অভ্যাস নেই বা অনেকের সামর্থ্যের মধ্যেও নেই; ফলে যে খাবারটি সবাই খায়, সে রকম খাবারে ভিটামিন ‘ডি’ যুক্ত করা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা ভোজ্যতেলকে সে রকম একটি সর্বসাধারণের খাবার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
আমাদের ভোজ্যতেলে এখন ভিটামিন ‘এ’ যুক্ত আছে। নতুন করে এর সঙ্গে ভিটামিন ‘ডি’ যুক্ত করলে ভিটামিন ‘ডি’র অভাব দূর করা যাবে। ইতোপূর্বে ২০১৩ সালে আইন করে ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ যুক্ত করা হয়েছিল; এবার সেই সঙ্গে ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘ডি’ মেশানো দরকার। এটা করা গেলে অনেকাংশেই ভিটামিন ‘ডি’র অভাব দূর হবে।
জনস্বাস্থ্য সম্পর্কে সরকারের নানা ধরনের উদ্যোগ রয়েছে। এই উদ্যোগের সঙ্গে উল্লিখিত উপায়ে নতুন করে আমরা ভিটামিন ‘ডি’ প্রাপ্তির বিষয়কেও যুক্ত করার অনুরোধ জানাচ্ছি। অনতিবিলম্বে ভোজ্যতেলে আইন করে ভিটামিন ‘ডি’ যুক্ত করুন। সেই সঙ্গে সরকার ভিটামিন ‘ডি’যুক্ত খাবার গ্রহণের বিষয়ে প্রচার বৃদ্ধিরও উদ্যোগ নিতে পারে। সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেক নাগরিককে আমরা এই স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানাচ্ছি। মনে রাখতে হবে, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আক্রান্ত হয় ব্যক্তিমানুষ। সমস্যা হলে ব্যক্তিরই হয়। সামগ্রিকভাবে পরে তা জাতিগত জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বলে বিবেচিত হয়। এ প্রসঙ্গে একজন মনীষীর কথা স্মরণ করছি, ‘সোনাদানা নয়, সুস্থাস্থ্যই হচ্ছে আসল সম্পদ।’