বর্ষপরিক্রমায় আবার এসেছে নতুন বছর। আজ সেই নতুন বছরের প্রথম দিন। রবীন্দ্রনাথের একটা গান আছে, ‘এসো, এসো হে বৈশাখ।’ এই যে আবাহন, এর ভেতর দিয়েই আমাদের প্রাণের আর্তিটুকু বোঝা যায়। জীবন ও প্রাণের এই আবাহন-গীতে বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে নতুন দিনটি। নতুন বছরে ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা থেকে মুক্ত হওয়াই হোক আমাদের লক্ষ্য।
আজ দেশের ক্রান্তিলগ্নে চতুর্দিকে পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে সামাজিক জরা। আমরা ব্যক্তিগত, রাষ্ট্রীয় ও বৈশ্বিকভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছি নানান সংকটে। নতুন বছর এই মালিন্য থেকে আমাদের মুক্তি দেবে, এ রকম প্রত্যাশা থেকেই রবীন্দ্রবাণীতে উচ্চারিত হয়েছে, ‘তাপস নিশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে।’ আমাদের সম্মিলিত প্রাণের দাবি এতেই নিহিত রয়েছে। যা কিছু জীর্ণ, যা কিছু ব্যর্থ, তাতে প্রাণ সঞ্চার করতে হবে। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনটি সেই আর্তি নিয়েই উপস্থিত হয়েছে।
বাংলা নববর্ষ বাঙালির সর্বজনীন জাতীয় উৎসব, অসাম্প্রদায়িক উৎসব। পয়লা বৈশাখ বাঙালির সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের উদযাপন এবং উপলব্ধির উৎসব। ১৫৫৬ সালে মুঘল সম্রাট আকবরের আদেশে তার রাজস্ব কর্মকর্তা ফতেহ উল্লাহ সিরাজী ‘সৌর সন’ এবং আরবি ‘হিজরি’ অব্দের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সন তৈরি করেন। ঐতিহাসিকদের মতে, আকবরের রাজ্যাভিষেকের সূচনাবর্ষ থেকে বঙ্গাব্দের গণনা শুরু হয়। সেই হিসাবে বঙ্গাব্দের রয়েছে মিলিত ঐতিহ্য, যা সর্বজনীন। জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে এই দিনটি আমরা সবাই পালন করে থাকি। পয়লা বৈশাখ তাই একটি তারিখমাত্র নয়; জাতিগত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে উদ্বোধিত হওয়ার দিন। এই দিনে আমাদের জাতিসত্তার বিষয়টিও আমরা নতুন করে স্মরণ করতে পারি।
পাকিস্তানি শাসনপর্বে বাঙালির সংস্কৃতিকে যখন মুছে দেওয়ার চেষ্টা হয়, তখনই ছায়ানট রমনার বটমূলে এই পরিচয়কে সামনে নিয়ে আসে। পয়লা বৈশাখ উদযাপনের মধ্য দিয়েই সাংস্কৃতিক উজ্জীবনের ধারাবাহিকতায় ‘বাঙালি’ আত্মপরিচয়ের প্রতিষ্ঠা ঘটে; পরে যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে বাংলা নববর্ষকে ঘিরে কোনো বিতর্ক গ্রহণযোগ্য হতে পারে না; অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনাও নয়।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় উৎসবমুখর পরিবেশে ও সাড়ম্বরে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের নির্দেশনা পাঠিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হবে ‘নববর্ষ আনন্দ শোভাযাত্রা’। ইউনেসকোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে এটি ইতোপূর্বে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ শিরোনামে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সমতলের পাশাপাশি পার্বত্য অঞ্চলেও বৈসু, সাংগ্রাই বা বিজু নামে নববর্ষ উদযাপিত হবে। নিরাপত্তার ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছে সরকার।
আমরা আশা করছি, এভাবে আজ আনন্দমুখর পরিবেশে সবার মানসলোকে দেশগত ঐক্যের যে সুর ধ্বনিত হবে, আসন্ন দিনগুলোতে তা বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেবে। দূর হয়ে যাবে সর্বব্যাপী দুর্নীতি, উদগ্র প্রদর্শনপ্রিয়তা, আত্মঘাতী হানাহানি, অন্তঃসারশূন্য কলহ, অনাকাঙ্ক্ষিত বিভাজন।
দেশ এখন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। এ সময়ে আরোপিত মঙ্গলভাবনা নয়, অন্তর থেকে জাগ্রত হোক আত্মশক্তির সংহতি। দেশের প্রতিটি সচেতন ও সুচেতন মানুষের এই হোক প্রত্যয়দীপ্ত ক্রমমুক্তির শপথ।
নববর্ষ উপলক্ষে লেখক, পাঠক, শুভানুধ্যায়ী সবাইকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।