ভারতশাসিত কাশ্মীরের পাহালগামে হামলার ঘটনায় সেখানে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। শ্রীনগর থেকে ৯২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চারপাশের মনোরম দৃশ্যের পাহালগাম গত মঙ্গলবার বিকেলে নৃশংস হামলায় রক্তাক্ত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ঘটে যাওয়া হামলার মধ্যে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ। ৩৫ বছরের মধ্যে এবারই প্রথম কাশ্মীরকে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ঘোষণা করা হয়। মঙ্গলবার রাতেই হামলার দায় স্বীকার করেছে পাক জঙ্গিগোষ্ঠী লস্কর-ই-তৈয়েবার ছায়া সংগঠন দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট (টিআরএফ)। তাদের মতে, নতুন আবাসিক আইনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকেই এ হামলার সূত্রপাত। কাশ্মীর রেজিস্ট্যান্স জানিয়েছে, ৮৫ হাজারের বেশি আবাসিক কার্ড অস্থানীয়দের দেওয়া হয়েছে। যা এখানে জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের পথ প্রশস্ত করেছে। এ অস্থানীয়রা পর্যটক হিসেবে আসে, বসবাসের অনুমতি নেয়। তার পর এমন আচরণ শুরু করে যেন তারা জমির মালিক। ফলস্বরূপ যারা অবৈধভাবে বসতি স্থাপনের চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে হিংসার ঘটনা ঘটবে।
বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ভারত। ইতোমধ্যে পর্যটকদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত সন্দেহভাজন তিন ব্যক্তির স্কেচ প্রকাশ করেছে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো। তিনজনই পাকিস্তানি নাগরিক বলে তথ্য এসেছে। তবে এ হামলা নিয়ে পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম আরওয়াই নিউজের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এটি একটি ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ বা সাজানো হামলা হতে পারে।
পাহালগামে হামলা কাশ্মীরের পর্যটন অর্থনীতিতে এক বিরাট আঘাত। অনেকে জম্মু-কাশ্মীরের পর্যটনশিল্পে বিনিয়োগ করেছেন, সেটাও ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রভাব এ খাতকে একধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছেন। ভারতের পাকিস্তান হাইকমিশনে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে যারা রয়েছেন তাদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে। সিন্ধু নদের চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। ভয়াবহ হামলার ঘটনায় শুধু ভারত-পাকিস্তানই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ঘটনাটি নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, হামলার দিন জলপাই রঙের পোশাক পরে ঘোড়ায় চেপে ছয়-সাতজন পাহালগাম রিসোর্টে প্রবেশ করে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ধর্মীয় পরিচয় যাচাই করে জঙ্গিরা ‘টার্গেট কিলিং’ চালায়। নিহতরা সবাই দেশি-বিদেশি পর্যটক। নিরাপত্তাবাহিনীর সন্দেহ, জঙ্গিরা পাকিস্তানের কিশতওয়ার থেকে সীমান্ত পেরিয়ে কাশ্মীরে ঢুকেছে। জঙ্গিদের ধরতে চিরুনি অভিযান চলছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এ হামলার খবর প্রকাশ্যে আসার পর থেকে পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ভারতের অবৈধভাবে অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরের অনন্তনাগ জেলায় হামলায় পর্যটকদের মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, এ হামলার সঙ্গে পাকিস্তানের কোনো সম্পর্ক নেই। পাকিস্তান সব সময় যেকোনো ধরনের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বিশ্বনেতারা এ হামলায় নিন্দা জানিয়ে ভারতের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। ভারতের কাশ্মীরে পর্যটকদের ওপর সন্ত্রাসী হামলায় নিন্দা জানিয়েছেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি। কাশ্মীর ইস্যুতে উত্তেজনা দিন দিন বাড়ছে।
ভারত-পাকিস্তান দুই দেশকেই সংকট নিরসনে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। তা না হলে উভয় পক্ষের কাদা-ছোড়াছুড়িতে উত্তেজনা আরও বাড়বে। তাতে উভয় দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়বে। কূটনৈতিক কলাকৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। সন্ত্রাস দমনে উভয় দেশ পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি ঐকমত্যে পৌঁছবে, সেটিই প্রত্যাশা।