সাম্প্রতিক কালে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে। প্রকাশ্যেই নারী নানা ধরনের হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। অনিরাপদ অসহনশীল পরিবেশ নারী ও মেয়েদের স্বাভাবিক চলাচলকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। অনলাইনে নিপীড়নমূলক অপপ্রচার থেকে শুরু করে জনপরিসরে নারী নিপীড়নের ঘটনা বেড়েই চলেছে। নিপীড়নের ধরনও পাল্টে গেছে। কিন্তু এই সহিংসতা ও নিপীড়ন বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের নীরবতা নিপীড়কদের পরোক্ষভাবে প্রশ্রয় দিয়ে চলেছে। নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি নির্যাতনের ধারা কমবেশি আগের মতোই রয়ে গেছে।
নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে এবং নারীর স্বাধীন চলাফেরায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র। মুন্সীগঞ্জ লঞ্চঘাটে যাত্রাবিরতি করা একটি যাত্রীবাহী লঞ্চে দুই নারীকে প্রকাশ্যে নিষ্ঠুর মারধরের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে সংস্থাটি। গত শুক্রবার রাতে এ ঘটনা ঘটে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল ‘বাংলাদেশ: নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনেও নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশে এ সমস্যা এতটাই প্রকট যে, প্রায় ৭০ ভাগ নারী তাদের জীবদ্দশায় অন্তত একবার হলেও শারীরিক, যৌন, মানসিক এবং অর্থনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন। এত গেল জরিপের চিত্র। কিন্তু বাস্তবে শুধু জনপরিসরের কথা বিবেচনা করলে আগের তুলনায় নারীর প্রতি এই সহিংসতার ধরন ও মাত্রা বেড়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত কয়েকটি ঘটনার কথা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের একটি ছবিতে বোরকা আর টি-শার্ট-প্যান্ট পরা দুই নারীকে লাঠি হাতে পাশাপাশি দাঁড়ানো দেখা গেছে। আন্দোলনের সময় ওই পোশাক নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। কিন্তু আন্দোলন শেষে ‘ওড়না গায়ে থাকা না থাকা নিয়ে’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে প্রকাশ্যে তার নিজের ক্যাম্পাসে তারই বিশ্ববিদ্যায়ের এক কর্মচারীর হাতে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। অভিযুক্ত কর্মচারীর পক্ষে এবং ওই মেয়ের বিরুদ্ধে একটি গোষ্ঠী তৎপর হয়ে উঠেছে। জামিনে মুক্ত হওয়া ওই কর্মচারীকে ফুলের মালা দিয়ে, পাগড়ি পরিয়ে বরণ করে নেয় গোষ্ঠীটি।
এর আগে নারীকে প্রকাশ্যে গোষ্ঠীবদ্ধভাবে নিপীড়নের আরও কয়েকটি ঘটনা ঘটে। বাসে ডাকাতির সময় যৌন নিপীড়ন এবং দেশের কয়েকটি এলাকায় নারী ফুটবল ও ক্রিকেট খেলা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এমনকি একজন নারী ফুটবলারের মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয়। বোঝাই যায়, নারী ফুটবল ও ক্রিকেটের বিরুদ্ধে একটা চক্র নতুন করে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। প্রকাশ্যে নারী নির্যাতনের সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটল মুন্সীগঞ্জে। প্রতিটি নিপীড়নের ধরন একই রকম। ‘মব’ (একদল উচ্ছৃঙ্খল মানুষ) সৃষ্টি করে বা মবের আশকারা পেয়ে নারীকে শারীরিকভাবে মারধর করছে। এই যে ‘মব’ বা উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে একত্রিত করে প্রকাশ্যে নারীকে হেনস্তা বা আক্রমণ করা হচ্ছে, এই প্রবণতা নতুন। জুলাই আন্দোলনের পর অন্য অনেক কিছুর মতো নারীও মবের শিকার হচ্ছেন।
নারী নির্যাতনকারীদের কঠোরভাবে দমনে সরকারের দিক থেকে দৃশ্যমান কিছু দেখা যাচ্ছে না। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাগুলো ‘ভাইরাল’ হলেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তৎপর হতে দেখা যায়। নাগরিক সমাজ ও নারী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে দেশের এই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির কথা বারবার বলা সত্ত্বেও সরকারি পর্যায় থেকে আশাব্যঞ্জক সাড়া মিলছে না। সরকারের নিষ্ক্রিয়তায় অথবা বিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়ায় পরোক্ষভাবে অপরাধীরা প্রশ্রয় পাচ্ছে। এর ফলে প্রকাশ্যে নারী নির্যাতনের ঘটনা বেড়েই চলেছে। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূর করতে হলে প্রকাশ্যে নারী ও কন্যা নির্যাতন বন্ধের ব্যবস্থা নিতে হবে। কঠোরভাবে দমন করতে হবে নারী নির্যাতনের সঙ্গে জড়িতদের। এ ক্ষেত্রে মবের সঙ্গে যুক্ত কিংবা মবকে যারা উৎসাহিত করবে, তাদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরি।
আরেকটি বিষয়ের প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সরকারের আইসিটি মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে যারা নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা ছড়ায়, তাদের শনাক্ত এবং নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এ নিয়ে নীতিমালা আছে, কিন্তু ব্যবস্থা গ্রহণের দৃষ্টান্ত নেই। সাইবারজগতেও এখন নারীর প্রতি সব ধরনের নির্যাতন চলে। এটা ঘটছে লিখিত বা ভিডিও আকারে। অনলাইন সংবাদমাধ্যমে নারীবিষয়ক লেখার নিচে কুৎসিত মন্তব্য করা হয়। এসবও নারী নির্যাতনের নতুন ধরন। কিন্তু আমাদের নারীরা জানেন না সাইবারজগতে নির্যাতনের শিকার হলে কী করতে হবে, কোথায় অভিযোগ জানাতে হবে। সরকারের এ সম্পর্কে প্রচারণামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি।
নারীর জীবন, স্বাধীনতা ও সম্মান রক্ষা আমাদের সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা। নারীর স্বাধীনতা, নারীর পছন্দ করার বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার, চলাফেরার অধিকার, সবই সাংবিধানিক অধিকার। এ অধিকারগুলো আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সনদ দ্বারাও স্বীকৃত। প্রকাশ্যে নারীর প্রতি সহিংসতা তাই অবিলম্বে বন্ধ হওয়া জরুরি। দেশের সাধারণ নাগরিকরা যেমন এই বিষয়ে সংবেদনশীলাতার পরিচয় দিতে হবে, তেমনি সরকারকেও এই নির্যাতন বন্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।