আলোচিত আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। ধর্ষণের ৭৩ দিনের মাথায় এ রায় ঘোষণা করেন আদালত। গত পরশু মাগুরা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এ রায় দেন। এ রায়ে আসামিদের একজনকে ফাঁসি এবং অন্য তিনজনকে খালাস দিয়েছেন বিচারক।
রায় নিয়ে বাদী-বিবাদী দুই পক্ষই তাদের সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে যা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে তা হলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে রায় দিয়ে আদালত নজির স্থাপন করেছেন। শিশু আছিয়াকে ধর্ষণের মাত্র ৭৩ দিনের মাথায় এ রায় এল। এ মামলার বিচার কার্যক্রমের সঙ্গে পূর্বাপর যারা জড়িত ছিলেন- যেমন পুলিশ, আইনজীবী ও আদালত, মামলাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে দ্রুত রায় দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এ মামলার বিচারিক ঘটনাক্রম লক্ষ করলেই কীভাবে সেটা সম্ভব হয়েছে বোঝা যাবে।
গত মার্চের ৬ তারিখে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ওই দিনই পুলিশ খবর পেয়ে চার আসামিকে আটক করে। পাশাপাশি প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে দেশ। চলতে থাকে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ-অবরোধ। দ্রুত বিচারের দাবি ওঠে। এর এক দিন পর ৮ মার্চ শিশু আছিয়ার মা মাগুরা সদর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণ এবং হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় শিশুটির বোনের শ্বশুর, শাশুড়ি, দুলাভাই ও দুলাভাইয়ের ভাইকে আসামি করা হয়। পুলিশ এদের আটক ও গ্রেপ্তার করে। আদালত পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান আসামিকে সাত দিন এবং অন্যদের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এরপর মামলা হলে ৩৭ দিনের মাথায় ১৩ এপ্রিল মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মাগুরার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে চার আসামির নামে অভিযোগপত্র জমা দেন।
পরে ১৭ এপ্রিল মামলাটি চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয় এবং ২০ এপ্রিল ট্রাইব্যুনাল অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন। এর তিন দিন পর ২৩ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের মধ্যদিয়ে শুরু হয় বিচার কার্যক্রম। ছুটির দিন বাদে সাক্ষ্যগ্রহণ চলে টানা ৯ দিন। এ ৯ দিনে মোট ২৯ জনের সাক্ষ্য উপস্থাপন করে রাষ্ট্রপক্ষ। এর মধ্যে এক দিন ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৩৪২ ধারায় আসামিদের শনাক্ত করা এবং তাদের বক্তব্য শোনেন আদালত। এর পর দুই দিন ধরে চলে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামি পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক। অবশেষে মাত্র ১৪ কার্যদিবসে এ মামলার রায় ঘোষণা করেন আদালত।
রায়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আইনজীবী ও গণমাধ্যম কর্মীরা বলেছেন, এ মামলাটি দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার ইতিহাসে অন্যতম দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তারা বলেছেন, প্রতিটি মামলার ক্ষেত্রে যদি এভাবে দ্রুততার সঙ্গে বিচার করা যায় তাহলে বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়বে। সেই সঙ্গে কমে আসবে অপরাধপ্রবণতা।
বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় রায়টি নানা কারণে মাইলফলক হয়ে থাকবে। ধর্ষণের ঘটনা জানাজানি হলে সারা দেশ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং সাধারণ মানুষ দ্রুত বিচারের দাবি জানাতে থাকেন। গণমাধ্যমে এ খবর প্রকাশিত হলে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা এবং তাদের বিচার করার জন্য তৎপর হয়ে ওঠে। এর পরের সবই এখন ইতিহাস। একটি মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য যতগুলো ধাপ আছে, আদালত তা যথাযথভাবে অনুসরণ করেছেন। এ রায় তাই নিঃসন্দেহে একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। রাষ্ট্র চাইলে দ্রুততার সঙ্গে বিচার করা সম্ভব, সেটাও প্রমাণিত হলো। তবে এ অপরাধের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের যে সক্রিয়তা দেখা গেছে, তার পেছনে ছিল জনগণের প্রবল চাপ। সরকার এ চাপকে উপেক্ষা করতে পারেনি।
বাংলাদেশে বহুকথিত একটা প্রবচন আছে, ‘জাস্টিস ডিলেইড ইজ জাস্টিস ডিনায়েড।’ বিচারের বিলম্ব মানে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়া। আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলা সেই প্রবচনকে মিথ্যা প্রমাণিত করেছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ন্যায়বিচার যেহেতু পাওয়া সম্ভব, আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, রাষ্ট্রের বিচারিক কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ভবিষ্যতেও এভাবে সক্রিয় হয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সাধারণ মানুষের বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করবে।