শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড- এ রকম একটি আপ্তবাক্য আমরা প্রায়ই উচ্চারিত হতে শুনি। বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ এটা বিশ্বাসও করে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, শিক্ষা নিয়ে আমাদের উদ্যোগ আশানুরূপ নয়। জাতীয় বাজেটে এর প্রতিফলন দেখা যায় না। খবরের কাগজে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসন্ন বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দ কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে মানসম্মত শিক্ষা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে বলে বিশিষ্টজনরা অভিমত প্রকাশ করেছেন।
উন্নত ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে, বাজেটে শিক্ষায় আমাদের অর্থের বরাদ্দ খুবই কম। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকোর মতে, শিক্ষায় একটা দেশের মোট জিডিপির ৫ থেকে ৬ শতাংশ অথবা মোট বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ থাকা দরকার। কিন্তু আমাদের বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দের পরিমাণ শুধু কম নয়, হতাশাজনক।
শিক্ষা এবং উন্নয়ন অর্থনীতিবিদরা বলেন, মানবসম্পদ হচ্ছে একটা দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। মানবসম্পদের ওপর নির্ভর করেই একটা দেশ উন্নত হয়। মানসম্মত শিক্ষাই মানবসম্পদ সৃষ্টিতে অবদান রাখে। মানসম্মত শিক্ষার পূর্বশর্ত হচ্ছে শিক্ষাক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা থাকা। কিন্তু বরাদ্দ যদি কম থাকে, তাহলে এ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত হয় না। শিক্ষার মানও বাড়ে না। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে কখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় না।
এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মরক্কো, ঘানা ও ক্যামেরুনের মতো ২৬টি নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান ২২তম। এই হিসাব গত ১০ বছরের। বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বরাদ্দের পরিমাণ ছিল বাজেটের ১১ দশমিক ৯৪ শতাংশ। তথ্য অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শিক্ষায় বরাদ্দ ছিল ৯৪ হাজার ৭১১ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১১ দশমিক ৮৮ শতাংশ। শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতসহ সর্বমোট বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ১১ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ। জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) তুলনায় শিক্ষায় বরাদ্দ প্রতিবছর কমছে। জিডিপির অনুপাতে যেখানে ২০২১-২২ অর্থবছরে শিক্ষায় বরাদ্দ ছিল ২ দশমিক ৮ শতাংশ, সেখানে চলতি অর্থবছরে (২০২৪-২৫) এ খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এবার ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সে বরাদ্দ আরও কমছে। জিডিপির ৫-৬ শতাংশ তো দূরের কথা, ৩ শতাংশেও পৌঁছায়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এত কম বরাদ্দ দিয়ে মানসম্মত শিক্ষা কখনো নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এ কারণে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে আমরা পিছিয়ে আছি। শিক্ষাবিজ্ঞানের শিক্ষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ড. ছিদ্দিকুর রহমান খবরের কাগজকে বলেছেন, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতের জন্য শিক্ষায় যথেষ্ট বরাদ্দ দরকার। মানসম্পন্ন শিক্ষকরাই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারবেন। সে লক্ষ্যে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পাঠদানে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, আধুনিক সিলেবাস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ উন্নয়ন, স্মার্ট সমৃদ্ধ শিক্ষা-উপকরণ এবং গ্রহণযোগ্য মূল্যায়নব্যবস্থা আবশ্যক। এসব বাস্তবায়ন করতেই পর্যাপ্ত বরাদ্দ দরকার।
গত মার্চে প্রাক-বাজেট আলোচনায় গণসাক্ষরতা অভিযানের পক্ষ থেকে আসন্ন বাজেটে শিক্ষা খাতে ১৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছিল। তাদের পর্যালোচনায় দেখা যায়, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে শিক্ষা খাতে সবচেয়ে কম বরাদ্দ হয় বাংলাদেশে। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ১৭টি বিষয়ের মধ্যে মানসম্মত শিক্ষা অন্যতম। ২০৩০ সালের মধ্যে গুণগত শিক্ষা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু গুণগত শিক্ষার দিক থেকে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমেই নিম্নমুখী। ২০২৪ সালে গ্লোবাল এডুকেশন ইনডেক্সের তালিকায় ১৪১ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১১৩তম।
দুঃখজনক হচ্ছে, দেশে ১১টি ভিন্ন বিষয় নিয়ে সংস্কার কমিশন গঠন করা হলেও শিক্ষা নিয়ে কোনো সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়নি। জুলাই আন্দোলনের মতো এত বড় আন্দোলনের পরে শিক্ষা কমিশন গঠিত না হওয়ার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। শিক্ষাকে আমরা কতটা গুরুত্ব দিই, এ থেকেই তা বোঝা যায়। শিক্ষাক্ষেত্রে বিষয়গত ও কাঠামোগত সংস্কার করে এতে গুণগত পরিবর্তন আনা এখন সময়ের দাবি। কিন্তু এ নিয়ে সমন্বিত কোনো উদ্যোগ নেই।
শিক্ষা খাতে আর্থিক বরাদ্দ অপ্রতুল। এ খাতের কাঠামোগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নেই। কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপও গ্রহণ করা হচ্ছে না। অথচ শিক্ষার মান বৃদ্ধির জন্য এর সবই জরুরি। সবার আগে দরকার বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি। সেই সঙ্গে বরাদ্দ করা অর্থ যাতে যথাযথভাবে ব্যয় হয়, তাও নিশ্চিত করা দরকার। শিক্ষা খাতে আসন্ন বাজেটে যে অর্থ বরাদ্দের কথা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, আমাদের প্রত্যাশা সরকার সেই বরাদ্দ আরও বৃদ্ধি করবে।