ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ গতকাল ষষ্ঠ দিনে নতুন বাঁক নিয়েছে। গত পরশু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে ‘সহজ লক্ষ্যবস্তু’ অভিহিত করে তাকে যেকোনো সময় হত্যা করা সম্ভব বলে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ‘ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে’ দাবি করে ট্রাম্প ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণও চেয়েছিলেন। এরই জবাবে গতকাল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেছেন, জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেবে ইরান। দেশটি দৃঢ় থাকবে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া শান্তির বিরুদ্ধেও। খামেনি আরও বলেছেন, ইরান কারও কাছে আত্মসমর্পণ করবে না।
এদিকে টানা ছয় দিনের মতো গতকালও মধ্যপ্রাচ্যে সূর্য উঠেছে ইসরায়েল-ইরানের পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাঝে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা ইসরায়েলের বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের হামলা নিরবচ্ছিন্ন, জটিল, বহুস্তরবিশিষ্ট এবং ধাপে ধাপে চলতে থাকবে।
বোঝাই যাচ্ছে, পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হচ্ছে। ইরান-ইসরায়েল ক্রমশ যুদ্ধে গভীর ও বিস্তৃতভাবে জড়িয়ে পড়ছে। আশঙ্কা দেখা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ারও। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যেসব খবর প্রকাশিত হচ্ছে, তাতে এই হামলা-পাল্টা হামলা এখন কেবল ক্ষেপণাস্ত্রে সীমাবদ্ধ নেই। ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা ইরানের বিরুদ্ধে বড় পরিসরে ‘সাইবার যুদ্ধ’ও শুরু করেছে। ওদিকে ইসরায়েলকে নিশানা করে ফাত্তাহ-১ হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান। ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে টেনে আনতে চাইছে। সে ক্ষেত্রে ইরান যে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা করে এই যুদ্ধকে আরও বিস্তার দিতে পারে, সেই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সর্বশেষ যে খবর তাতে এই যুদ্ধে ইরানের ২২৪ এবং ইসরায়েলের ২৪ নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। দুই দেশেরই অনেক এলাকা আক্রমণের শিকার হয়েছে। যুদ্ধ যেভাবে বিস্তার লাভ করছে, তাতে হতাহতের সংখ্যা বাড়বে। অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতিও বৃদ্ধি পাবে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। ইরান ও ইসরায়েলের অভ্যন্তরেই বহু মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ঠাঁই নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ইরান ও ইসরায়েলে কর্মরত বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা দেশ দুটি ছেড়ে যাচ্ছেন। বাংলাদেশেরও প্রায় ৪০০ মানুষ নানা কাজে ইরানে আটকা পড়েছেন। তারাও ভীষণ আতঙ্কের মধ্যে আছেন। সবচেয়ে বড় বিষয়, এসব মানুষ জীবন সংশয়ের কারণে যে মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, সেই ক্ষতি অপূরণীয়।
আমরা মনে করি, অবিলম্বে এই যুদ্ধ বন্ধ হওয়া উচিত। অনতিবিলম্বে এই যুদ্ধের অবসান হওয়া তাই বাঞ্ছনীয়। আমদের পৃথিবী এমনিতেই নানা সমস্যায় জর্জরিত, এই মুহূর্তে আরেকটি যুদ্ধের ভার বহন করবার শক্তি তার নেই। ধনী দেশগুলোর সমস্যা নেই, কিন্তু আমাদের মতো দেশগুলোর জন্য তা চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে। আমাদের অর্থনীতি এমনিতেই ভঙ্গুর। অর্থনৈতিক সংকট তীব্র। এমতাবস্থায় এই যুদ্ধ আমাদের সংকটের গভীরে নিপতিত করবে। আমরা তাই যুদ্ধরত দুই দেশকে আহ্বান জানাব যুদ্ধ বন্ধের। এই যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিরপেক্ষ ভূমিকা দেখতে চায় বিশ্ব। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ৬০ শতাংশ মানুষ এই যুদ্ধ চায় না বলে এক জরিপ থেকে জানা গেছে।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘আজ মানুষের জয়ধ্বনি নয়, আজ সভ্যতার পরাজয়ের করুণ ধ্বনি চারিদিকে শুনতে পাচ্ছি।’ এই মানবিক পরাজয় নয়, জয়ধ্বনি উঠুক মানবতার। মনে রাখা প্রয়োজন, যুদ্ধ কখনোই শান্তি বয়ে আনে না। দার্শনিক জর্জ বার্নার্ড শ বলেছিলেন, শান্তি কেবল যুদ্ধের চেয়ে ভালো নয়, বরং অসীম কল্যাণকর।’ আমরা এরই প্রত্যাশা করছি।