জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আলোচিত ‘জুলাই জাতীয় সনদে’র খসড়া প্রকাশ করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। গত সোমবার এই খসড়া সনদের কপি রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠিয়েছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, এই খসড়ায় জাতীয় সনদের পটভূমি, গঠন-প্রক্রিয়া, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন এবং জাতীয় সনদ তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিশদ বর্ণনা আছে; আর আজ ৩০ জুলাই দুপুর ১২টার মধ্যে দলগুলোর সুপারিশ, পরামর্শ, পরিবর্তনের কথা কমিশনকে জানানোর অনুরোধ জানিয়েছে ঐকমত্য কমিশন। তারা আশা করছে, রাজনৈতিক দলগুলোর পরামর্শকে সমন্বিত করে সনদের ‘টেক্সট’ আজই তৈরি করে ফেলতে পারবে।
অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর সংস্কার কমিশন এ বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করে। তারা তাদের সুপারিশকৃত ১৬৬টি সুপারিশ নিয়ে দুই দফায় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শেষ করার পর আগামীকালের মধ্যে এই খসড়া চূড়ান্ত করবে বলে জানানো হয়েছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ বলেছেন, জুলাই সনদকে ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে তৈরি করতে চায় কমিশন। এর মাধ্যমে সংস্কার সম্পর্কে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।
সর্বসম্মতিতে এই সনদটি প্রণীত ও গৃহীত হলে দেশ নির্বাচনের পথে আরও একধাপ এগিয়ে যাবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক দল এবং সচেতন শ্রেণি উপলব্ধি করছিলেন, পুরোনো ব্যবস্থা পুরোপুরি বহাল রেখে দেশ শাসনের দিন শেষ হয়ে গেছে। বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, আর্থ-প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন বাহিনী, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বতন্ত্রভাবে কাজ করার ক্ষমতা, সংবিধানের সীমাবদ্ধতা দূর করা, আইনের শাসন, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, সুশাসন, সদাচার এবং জবাবদিহির কোনো বিকল্প নেই। উল্লিখিত বিষয়গুলো নিশ্চিত হলে দেশে গণতন্ত্রের চর্চা সুপ্রতিষ্ঠিত হবে; অন্তত সে রকম একটি দলিল দেশবাসী পেতে চলেছে।
প্রস্তাবিত সনদে বলা হয়, রাজনৈতিক দলগুলো সুস্পষ্ট অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে দেশকে গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে নেবে। আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জয়ী দল সরকার গঠনের দুই বছরের মধ্যে উল্লিখিত সংস্কারগুলো সম্পন্ন করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। সংস্কারের এই উদ্যোগ দেশের বর্তমান সার্বিক পরিস্থিতির বিবেচনায় নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।
৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি। দেশ নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে চলছে। নাগরিক জীবনে স্থিরতা আসেনি। অর্থনীতির অবস্থাও আশানুরূপ নয়। সামাজিক জীবনের চলছে অস্থিরতা। কখনো কখনো চরম অবনতি ঘটেছে। মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধেরও শঙ্কা দেখা গেছে। দেশে স্বাভাবিক অবস্থা বজায় রাখার জন্য অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে তাই বারবার দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানানো হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদ প্রণীত হলে আর তার ভিত্তিতে নির্বাচন হলে তা নির্বাচন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। দেশ গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরবে।
ইতোমধ্যে এই নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। নির্বাচন কমিশন জোরেশোরে প্রস্তুতি নিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও নির্বাচন অনুষ্ঠানের উপযোগী করে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সাংবাদিকদের জানানো হয়েছে, নির্বাচনের আগে প্রশাসনের প্রয়োজনীয় রদবদল ঘটানো হবে; মোতায়েন করা হবে ৬০ হাজার সেনা। সেই সঙ্গে পুলিশ বাহিনীরও প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতি চলছে।
এ কথা বলাই যায়, দেশ নির্বাচনি সড়কে উঠে গেছে এবং ক্রমশ তা গতি পাচ্ছে। নির্বাচনি তফসিল ঘোষণা করা হলে দেশ পুরোপুরি নির্বাচনি আয়োজন-উৎসবে মেতে উঠবে। বিগত নির্বাচনগুলোর তুলনায় আসন্ন নির্বাচন যে অনেক দিক থেকে আলাদা হবে, ইতোমধ্যে তারও ইঙ্গিত মিলছে। আমরা মনে করি, এখন নির্বাচনের দিকেই সরকারের পুরোপুরি মনোযোগ নিবদ্ধ থাকা জরুরি। সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য যা যা করণীয়, সেসবই সরকার করবে। দেশবাসী এখন অনেকটাই নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে।