এ যেন মহাখাদক। এই পাহাড়খেকোদের করাল গ্রাসে সাবাড় হয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের পর পাহাড়। নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। সরকারি ভূমি চলে যাচ্ছে ব্যক্তিমালিকানায়। ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড় কাটায় নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা অগ্রাহ্য করে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এসব রক্ষা করার যথাযথ কর্তৃপক্ষ আছে। আছে আইন। কিন্তু রক্ষা করার কেউ নেই। সবই যেন বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেড়ো। পাহাড় সাবাড়ের মহোৎসব চলছে। সম্মিলিতভাবে চলছে দস্যুতা। এই চিত্র চট্টগ্রাম মহানগরী ও তৎসংলগ্ন আশপাশের এলাকার। গতকাল খবরের কাগজের শীর্ষ প্রতিবেদন থেকে পাহাড় সাবাড়ের যে বিবরণ পাওয়া গেল তা ভয়াবহ।
বাংলাদেশের একজন প্রথিতযশা কবি ভিন্ন এক প্রসঙ্গে মানচিত্র খাওয়ার কথা বলেছিলেন। ঠিক সে রকমই প্রাকৃতিক অনুষঙ্গে মানচিত্র খাওয়ার মতো পাহাড় খেয়ে ফেলছেন চট্টগ্রামের ভূমিদস্যুরা। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ভূমিদস্যু, মাটিখেকো, শিল্পগ্রুপ এবং রাজনৈতিক দলের নেতারা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে পাহাড় কাটায় ভূমিকা রেখে চলেছেন। পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসনসহ সরকারি সংস্থাগুলো নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রক্ষকই অবতীর্ণ হচ্ছে ভক্ষকের ভূমিকায়। নিজেরাই পাহাড় কাটছে। প্রশাসন মাঝে মাঝে লোক দেখানো অভিযান চালালেও দখলদারদের সঙ্গে পেরে ওঠেনি।
খবরের কাগজের প্রতিবেদনের পুরো বিবরণ তুলে ধরলে রীতিমতো মহাকাব্য হয়ে যাবে। চট্টগ্রাম শহরতলির সলিমপুর জঙ্গল আর আলীনগরে এখন পাহাড় কাটার মহোৎসব চলছে। সলিমপুরে দখলকারীর সংখ্যা ১২ হাজারের বেশি। সলিমপুর ও আলীনগরে প্রশাসন যতবার অভিযান চালিয়েছে, ততবারই হামলার শিকার হয়েছে। এ যেন এক ভিনদেশ। সেখানে পাহাড়খেকোদের রাজত্ব ছাড়া প্রশাসনের লোকজন, পুলিশ, সাংবাদিক কেউ ঢুকতে পারেন না। ঢুকলেও হামলার মুখে ফিরে আসতে বাধ্য হন। এখানে অভিযান চলাতে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, ইউএনও, ওসিসহ অনেকে। বিএনপির স্থানীয় নেতারাই এখানে রাজাধিরাজ।
পাহাড় কেটেই ভূমিদস্যুরা থেমে থাকেনি। পাহাড় কেটে তৈরি করা জমিতে নির্মাণ করেছে বহুতল ভবনসহ অসংখ্য ভবন ও হাউজিং সোসাইটি। ভবন নির্মাণের জন্য পরিবেশের ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক হলেও কেউ তা নেয়নি। তথ্য না পাওয়ার অজুহাতে হাত গুটিয়ে বসে থেকেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ।
বিস্ময়কর হচ্ছে, যাদের পাহাড় রক্ষা করার কথা, তারাও পাহাড় কাটায় জড়িয়ে পড়েছেন। নগরীর জালালাবাদ এলাকায় পাহাড় কেটে আবাসিক এলাকা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন সিটি করপোরেশনের সাবেক এক কাউন্সিলর। সিটি করপোরেশনের লেকসিটি হাউজিং সোসাইটি গড়ে উঠেছে পাহাড় কেটে। উন্নয়নের নামে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ১৮টি পাহাড় কেটে ফেলেছে। এমনকি পরিবেশ অধিদপ্তরের অফিস নির্মাণ করা হয়েছে পাহাড় কেটে। রেলওয়ে, গৃহায়ণ, গণপূর্ত, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ সব সরকারি সংস্থা পাহাড় কেটেছে।
পাহাড় কাটার এই মহোৎসবে নানা ধরনের সেবা দিয়ে সাহায্য করে চলেছে পিডিবি, ওয়াসা, এমনকি মসজিদ কর্তৃপক্ষ। যারা পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন করেছেন বা প্লট বানিয়েছেন, তাদের সেবা দিয়ে এই সংস্থাগুলো সহায়তা করছে।
বেশ কিছু পাহাড়ের মালিক সরকারি প্রতিষ্ঠান। সরকারি প্রশাসন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এই পাহাড় কাটা নিয়ে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। পাহাড় সুরক্ষার জন্য একটা ব্যবস্থাপনা কমিটি আছে। সেই কমিটির সভাপতি চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার। তিনি সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে কাউকে পাহাড় কাটার সুযোগ দেওয়া হবে না বললেও তাদের তৎপরতা প্রায় শূন্য। এই কমিটির ভারপ্রাপ্ত সদস্যসচিব খবরের কাগজকে বলেছেন, পাহাড় কাটার বিষয়টি তারা জানেন না। জেলা প্রশাসকেরও কোনো বয়ানও মেলেনি। চট্টগ্রাম ওয়াসা বলেছে মাঠকর্মীরা তাদের তথ্য দেয়নি। পরিবেশ অধিদপ্তরের বক্তব্য, যখনই পাহাড় কাটার খবর পাচ্ছে, তখনই বন্ধ করা হচ্ছে পাহাড় কাটা। তাদের সমস্যা, নিজস্ব পুলিশ নেই। আসলে চট্টগ্রামে পাহাড় কাটা হয়, কিন্তু প্রশাসন দেখে না। পাহাড়ে কোনো ধরনের সেবা না দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও সিডিএ, ওয়াসা, পিডিবি, পরিবেশ অধিদপ্তর তা অনুসরণ করে না। অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা করে আইনের আওতায় আনার নজিরও তেমন নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তৎপর নয়।
পরিস্থিতি যা-ই হোক, চট্টগ্রামের পাহাড় রক্ষা করার বিকল্প নেই। পাহাড় যারা কাটছে, তারা যে-ই হোক, কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা- তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তবে সবার আগে কীভাবে এখনই পাহাড় রক্ষা করা যায়, প্রশাসনকে সে ব্যাপারে উদ্যোগী হতে হবে। সিডিএ, ওয়াসা, পিডিবি, জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশনসহ সব সেবা সংস্থাকে সমন্বিতভাবে শক্ত অবস্থান নিয়ে এই পাহাড় কাটা বন্ধ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা যথার্থই বলেছেন, সরকারি-বেসরকারি অংশীজনদের সমন্বিতভাবে প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুললে চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো রক্ষা করা যাবে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো একবার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে তা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। আমরাও তাই মনে করি। ইতোমধ্যে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তবে সব শেষ হয়ে যায়নি। এখনো যেসব পাহাড় অবশিষ্ট আছে, সেই পাহাড়গুলো রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সবাই এগিয়ে আসবে বলে আমরা প্রত্যাশা করি।